আমার ভালোবাসার বোন
মায়ের মৃত্যুর আগে, মা আমাকে ডেকে কাছে নিলেন৷ আমার মাথায় হাত দিয়ে মা বলেন, 'রানা তোর বোনকে দেখে রাখিস। আমি চলে গেলে সব তোর দায়িত্ব। '
সেইদিন মা চিরবিদায় নিলেন। মায়ের মৃত্যুর আগে আমি বস্তির এদিক ওদিক দৌড়ঝাঁপ করলাম৷ কেউ আমার সাহায্য করেনি। বস্তির রাস্তার মাথায় ঔষধের দোকান দিয়ে বসেছিলেন করিম চাচা। আমি দৌড়ে উনার কাছে গেলাম। চাচাকে বললাম," চাচা আমার মা কেমন জানি করছে। কিছু ঔষধ দেন। আপু টাকা দিয়ে দিবে"
'রানা তোর মায়ের এই ঔষধ দিয়ে কিছু হবে না। বড় ডাক্তার দেখাতে হবে৷ হাসপাতালে নিতে হবে৷ '
"কেন চাচা? আপনার কাছে কত ঔষধ! "
'তোর মায়ের কিডনির সমস্যা। হাসপাতালে নিতে হবে। তোর বোনকে বল নিয়ে যেতে। '
আমি তখন এত কিছু বুঝতাম না। কথা শেষ হওয়ার আগেই দৌড়ে বাসায় আসলাম। মা ততক্ষণে বিছানায় ছটফট করছে।
ঔষধ দোকান থেকে আসার পরই মা মারা যায়।
আমি মায়ের পাশে বসে কান্না করছি। আপু তখন বাসায় আসে। মাগরিবের আজান হচ্ছে। বাসায় কোন বিদ্যুৎ নেই। কুপির আলোয় মায়ের মুখ খানা ঝলমল করছে। বস্তির অনেক মানুষ আসলো। রাতেই মায়ের লাশ নিয়ে নদীর পাড়ে মাটি দেওয়া হলো।
মা যখন মারা যায় আমার বয়স তখন ৮বছর। আপু আমার থেকে ৫-৬ বছরের বড়। মায়ের লাশ মাটি দেওয়ার পর বাসায় আসলে রিপা আপু আমাকে জড়িয়ে ধরেন অনেক কান্না করেন।
আমাদের মাথার উপর ছায়াটুকু আর নেই। জন্মের পর থেকেই মাকে দেখে এসেছি। বাবার কথা জানতে চাইলে বলতো গাড়ির নিচে পড়ে মরে গেছে।
মা মারা যাওয়ার পরেরদিন সকালে বাসায় একটুও খাবার নেই।
আপু তখন বাসায় কিছু বিস্কুট আর জুস নিয়ে আসে।
আপু একটা বাসায় কাজ করতো। আমাদের খাবার দিতো আর আপুকে মাসে পাঁচশত টাকা দিতো৷ আমাদের দু'জনের জীবন ভালোই চলতো। বস্তির বাসা ভাড়া ছিলো ২০০ টাকা। আমি বস্তির স্কুলে পড়তাম। আপু তখন আমাকে খুব করে বুঝাতেন। আর বলতেন, একদিন বড় হবি আর ডাক্তার হবি।
মানুষের সেবা করবি। মা মরার আগে বলেছিলো আপুর খেয়াল রাখতে। আমিও মনে মনে অনেক ভাবতাম, বড় হয়ে আপুকে একটা বড় বাড়িতে রাখবো। আপুর খেয়াল রাখবো।
আপু একদিন কাজ থেকে কান্না করতে করতে ফেরে।
সেদিন আপু আমায় বুকে জড়িয়ে ধরে অনেক কান্না করেন। আপু কান্না করতে করতে বলে," কু-নজর থেকে বাঁচা সম্ভব নয়। কাজ করেও খেতে দিবে না। "
সেইদিন আপুর কথার মানে বুঝিনি। আমরা কয়েকদিন খেয়ে না খেয়ে ছিলাম। আমাদের পাশের বাসায় থাকতো শায়লা। আমি ও শায়লা তখন একসাথে পড়তাম৷ শায়লার মা আমাদের খাবার দিয়েছিলেন।
কয়েকদিন পর আপু শায়লার মায়ের সাথে গার্মেন্টস ফ্যাক্টরিতে চাকুরী নেয়। কোন রকম আমাদের দিন চলতে থাকে। গার্মেন্টস ফ্যাক্টরিতে চাকুরী নেওয়ার বছরখানেক পর। একদিন শায়লা কান্না করতে করতে আসে,
"রানা আম্মুর কারখানায় আগুন লাগছে। বস্তির সবাই যাচ্ছে"
'চল আপুও আছে। '
সেইদিন বস্তির সবাই গিয়েছে কারখানায়। সবাই সবার আপনজনকে খুঁজ করতে থাকে। ৪তলার ভবনে আগুন লাগে। নিচতলার সবাই বের হতে পারলেও উপরের দু-তলার কেউ বের হতে পারেনি। অনেকে আগুনে পুড়ে যায়। আবার অনেকে জীবন বাঁচাতে ঝাপ দিয়ে মারা যায়। রিপা আপুও শায়লার মা চতুর্থ তলায় কাজ করতো। এক এক করে, অনেক পুড়া লাশ বের করা। হয়৷ অনেককে হাসপাতালে নেওয়া হয়। সেইদিন লাশ খুঁজতে থাকি।
আপুকে হাসপাতালে ভর্তি করানো হয়। আমি ও শায়লা আপুর কাছে গেলাম। আপু আমাকে হাত দিয়ে ধরে মাথায় হাত বুলিয়ে দিয়েই দুনিয়া ছেড়ে দেয়। শায়লার হাত'টা শক্ত করে ধরে সেইদিন অনেক কেঁদেছিলাম। আপুর লাশটা আর আমি দেখিনি। শায়লার মা'কে খুঁজে আর পাইনি। এই ব্যাস্ত শহরে আমি ও শায়লা একা চলা শুরু।
শায়লার মায়ের নাম কোথাও নেই। আমাদের বস্তির অনেকে হারিয়ে গিয়েছে। হাজার মানুষের ভেতর হয়তো হারিয়ে গেছে। আমার ও শায়লার জীবনটা আগুনে পুড়ে কয়লা হয়ে গিয়েছিলো৷
মায়ের কথা রাখতে পারিনি। আপুর দেখার দায়িত্ব পালন করতে পারিনি। মা ও বোনকে বাঁচাতে পারিনি। চিকিৎসার অভাবে সেইদিন গুলোর কথা ভুলিনি।
আমি ও শায়লা একটা এতিমখানায় চলে যাই। খাবার ও পড়াশোনা ভালো করে চলতে থাকে। আপু ও মা'কে ছাড়া একা জীবন। এতিম থানায় পড়াশোনায় ভালো হওয়ায়। ফ্রি ডাক্তারী পড়ার সুযোগ হয়৷ শায়লা অনার্স করে আর আমি ডাক্তারি।
পড়াশোনা শেষ করে আমি চাকুরী পেয়ে যাই। শায়লাকে বিয়ে করি। আমাদের জীবন ভালোই চলে। যে বস্তি থেকে উঠে আসা, সেই বস্তুি কখনো ভুলে যাইনি। যেখানে মায়ের মৃত্যু হয়। করিম চাচা আজও সেখানেই ফার্মেসি চালান। আমি সপ্তাহে একবার করিম চাচার দোকানে বসে, সবাইকে ফ্রি চিকিৎসা দেই।
আমাদের জীবন ভালোই চলছিলো। একদিন টিভিতে দেখতে পাই আমাদের বস্তি পুরো আগুনে জ্বলছে। ছুটে যাই। সেখানে মানুষের আহাজারিতে চারদিক, আমার কান বন্ধ হয়ে আসছিলো। আগুনে পুড়া মানুষ গুলো দেখে, আমি আমার বোনের কষ্ট গুলো যেনো নিজের চোখে দেখছি আবার।
দমকল কর্মী এসে আগুন নেভানো কাজে লাগে। আমি ও আমার টিম নিয়ে সবাইকে চিকিৎসা দেওয়ার চেষ্টা করি। আমার বোনের মতো একজনকে দেখলাম। বয়স ১৪-১৫ বছরই হবে। দেহের অনেকটাই পুড়ে গেছে। আমি তাকে চিকিৎসা করছি। আমি যেন নিজের বোনকেই চিকিৎসা করছি। মায়ের সে কথা স্বরণ হলো, তোর বোনকে দেখে রাখিস। চোখের জল পড়ছে মেয়ে'টাকে দেখে। বস্তির আগুনে, মানুষ বেশি আগুনে পুড়েনি। কয়েকজনের গা আগুন লেগেছে সবার চিকিৎসা চলছে৷ কেউ মারাও যায়নি। সবাই সুস্থ হয়ে উঠে চিকিৎসার পর।
তারপর থেকে অসহায় মানুষের চিকিৎসা করতেই এদিক ওদিক চলে যাই। আমার বোনের মতো যেন কেউ না চলে যায়। সবার ভেতর বোনকে অনুভব করি। আমার এক বোনকে দেখে রাখতে পারিনি। সব বোনকে দেখে রাখার প্রতিজ্ঞা করি।
আমার জীবনে বোনের ভালোবাসা ছাড়া কিছু নেই। আজ বোন থাকলে তাকে বড় বাড়িতে অনেক সুখে রাখতাম। দেখে রাখতাম৷ বোনের জন্য সবসময়ই দোয়া করি, যেনো উপরে ভালো থেকে।
--সমাপ্ত --
গল্প -বোন।
লেখা-সোলাইমান রানা (দাদা)
Comments
Post a Comment