ফিরে দেখা
❝ফিরে দেখা❞
🖋 #এম_এইচ_নীলয়
পর্ব: ১৪ ও অন্তিম পর্ব
হঠাৎ দরজা খুলে গেল আর লম্বা পা ফেলে তুর্যকে এগিয়ে আসতে দেখলাম। তবে তুর্যকে দেখে যতটা না অবাক হলাম, তার থেকে ওর পাশে আরো দুটি মেয়েকে অস্ত্র হাতে এগিয়ে আসতে দেখে বেশি অবাক হলাম। আমি বা অর্পি শুধু বড়ো বড়ো চোখ করে তাকিয়েই রইলাম কিছু বলতে পারলাম না, কারণ আমাদের হাত পা বাঁধার সাথে মুখও কাপড় গুঁজে রাখা।
তবে তুর্য তার শয়তানি হাসি দিয়ে বলল, “ওয়েলকাম মাই ডিয়ারেস্ট এনিমিস!”
রাগে শরীর জ্বালা করলেও কিচ্ছুটি করার নেই, সাথে বলারও নেই। তবে চোখের অগ্নি চাহনি দেখে ও হয়ত কিছু একটা বুঝে ফের বলে ওঠল, “নো নো মাই ডিয়ার, এমন করে রাগতে নেই। প্রবাদে আছে, রেগে গেলেন তো হেরে গেলেন!”
বলেই ফের অট্টহাসিতে ফেটে পড়ল। যেন খুব বড়ো একটা জোকস ছিল, না হাসলেই জরিমানা। হাসির তাল রেখেই বলতে থাকল, “তোদের দুজনের সাথে আমার অনেক পুরানো হিসেব নিকেশ বাকি, কিন্তু আজ এভাবে পেয়ে সব ভুলে যাচ্ছি রে-সব ভুলে যাচ্ছি!”
আচমকা হাসি থামিয়ে কঠিন মুখে হিসহিসিয়ে বলল, “তোদের কাটব নাকি মারব সেটাও ভেবে পাচ্ছি না!”
আমি কোনোরকম প্রতিক্রিয়া না দেখিয়ে শীতল দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইলাম। ও আমার এমন নিস্তরঙ্গ আচরণে কিছুটা ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে গেল। হঠাৎ আমার মুখে গুঁজে রাখা কাপড় সরিয়ে দিয়ে বলল, “আমি জানি তোরা দুজনেই হাজারটা প্রশ্ন নিয়ে অপেক্ষা করছিস, কিন্তু আমার হাতে এতো সময় নেই। তাই তোদের...”
তুর্যকে থামিয়ে দিয়ে বলে ওঠলাম, “আমারও তোর বকবক শোনার সময় নেই, স্রেফ দুজনকে গুলি করে মেরে ফেল। তবে হ্যাঁ, তোর সহকারী জেনি ও সুপ্তির হাতে যেন আমাদের গুলি করা হয়, একদম হার্ট বরাবর। তাহলে মৃত্যুটাও ভয়ানক কষ্টের হবে আর তোর প্রতিশোধ নেওয়াটাও ষোলোকলা পূর্ণ হবে। দুজনেই কিনা দুই প্রিয় মানুষের হাতে জীবন দিলো, এর থেকে যন্ত্রণার আর কী হতে পারে?
আমার এই কথা বলার পেছনে একটাই উদ্দেশ্য, ওদের আইডেন্টিটিফাই করা। তবে আমার আশায় গুড়েবালি, ও আমাকে হাত তুলে থামিয়ে দিয়ে বলল, “দুঃখিত বন্ধু তোদের ইচ্ছে পূরণ করতে পারলাম না!”
“কেনো, তুই যে বললি শেষ ইচ্ছে পূরণ করবি?”
কথা বলা শেষ হতেই ওর হাতে ধরা ট্যাবটি আমার দিকে বাড়িয়ে দিল। দেখেই চোখ বিস্ফোরিত হয়ে গেল, কারণ একটা অপরিচিত মেয়ে ও আমার আম্মুর শরীরে বোমা সেট করে আমাদের মতো করেই চেয়ারের বাঁধা আছে! রুমের প্যাটার্ন দেখে মনে হচ্ছে না আশেপাশে কোথাও ওরা। কারণ ওই রুমটা বেশ ঝকঝকে ও আলোকিত। আধুনিক ফ্ল্যাটের মতন।
অপরিচিত মেয়েটা যে সুপ্তি এটা বুঝতে বাকি রইল না, কারণ ও ইতোমধ্যে জানিয়েছে আমার মা ও অর্পির বোনকে জিম্মি করে রেখেছে। তাহলে তুর্যর পাশে রঙচটা জিন্স, শার্ট, কেডস ও মুখে বাঘিনীর মুখোশ লাগানো মেয়ে দুটি কে? আমি তো আরো ভেবেছিলাম, একজন সুপ্তি আর অন্যজন জেনি!
আমার ভাবনার জবাব দিতেই তুর্য ওদের দুজনের মুখোশ টেনে খুলে ফেলল। একটা জেনি আর অন্যজন কিছুক্ষণ আগে আমাদের পিস্তলের মুখে কিডন্যাপ করা মেয়েটি! জেনিকে দেখে একটা দীর্ঘশ্বাস ছাড়লাম, কী নিখুঁত অভিনয়টা না সে করল! অ্যাওয়ার্ড পাবার মতোই।
“তোর শত্রুতা আমার ও অর্পির সাথে, কিন্তু তুই কেন নপুংসকের মতো আমার মা ও সুপ্তিকে আটক করেছিস? যারা প্রতিশোধ নেওয়ার জন্য পরিবারের মেয়েদেরকে জিম্মি করে, সেও মেয়ে ছাড়া কিছু নয়! তোর হাতে অস্ত্র মানায় না, চুড়ি মানায়- শালা শুয়োর, হিজড়া!”
কথাটা কাজে দিছে, আমিও চেয়েছিলাম ও রেগে যাক। তুর্য একটা দামী কথা কিছুক্ষণ আগেই বলেছে আর সেটার শিকারই ওকে করব! হলেও তাই, রেগেমেগে আমার কলার ধরে কয়েক ঘুসি মারল। আমি ব্যথায় ককিয়ে উঠতে গিয়েও থেমে হাসতে থাকলাম। আমি চাই, ও রেগে জ্ঞানশূন্য হয়ে সব সত্যিটা গড়গড় করে বলে দিক।
“তোকে মেরে পুঁতেই পরিচয় দিব আমি হিজড়া না পুরুষ?”
রাগে গজগজ করতে থাকল আর আমি হেসেই খুন। তারপর থেমে বললাম, “তুই সেদিনই হিজড়ার পরিচয় দিছিস যেদিন ভেন্টিলেশনে থাকা নেহাকে খুন করিয়েছিস!”
“নেহাকে তো আরো আগেই বিভৎসভাবে পুড়ে মরার কথা ছিল কিন্তু তুই ওকে বাঁচিয়ে নেওয়াতে সুন্দর মৃত্যু দান করেছিস। এটা তুই প্রাক্তন স্বামী হিসেবে সেরা উপহার দিছিস তাকে। গ্রেট জব নিহাল, গ্রেট জব!”
বলেই খ্যাঁক খ্যাঁক করে হাসতে থাকল আর আমার পিত্তি জ্বলে ওঠল। মনেমনে অশ্রাব্য ভাষায় গালি দিয়ে মুখে বললাম, “তোর লজ্জা করা উচিৎ, একটা নিরীহ মেয়েকে এভাবে মেরে বীরের কাহিনী শোনাচ্ছিস!”
“অবশ্যই বীরের কাহিনী, নয়ত ও বেঁচে থাকলে আমরাই কেলেঙ্কারিতে পড়ে যেতাম। সব প্রমাণাদি তোর কাছে চলে যেতো, বিশেষ করে নিধি ধরা খেয়ে যেতো।”
“নিধি! সে আবার কে?”
ফের হেসে কুটিকুটি হয়ে পাশে দাঁড়ানো জেনিকে দেখিয়ে বলল, “এই হলো আমার সুপার লেডি নিধি। যে তোর কাছে জেনি পরিচয়ে ছিল, এই নামে থাকার বিশেষ কারণ হলো অর্পির ছোটো বোন সুপ্তি। কারণ সেও আন্ডারকভার মিশনে আমার এখানে জেনি নামেই ছিল, তাই এই নামেই নিধিকে তোর কাছে পাঠাই!”
“ওরে শালা! কত বড়ো মূর্খ বানিয়ে ধোঁকা দিলি তোরা। মেয়ে মানুষ দ্বারা পৃথিবীর সবই সম্ভব, কী সুন্দর ও নিখুঁত অভিনয় পারে তারা!” কথাগুলো মনে মনে বললেও প্রকাশ করলাম না। কারণ নিজের দুর্বল পয়েন্ট কী করে ফাঁস করি, লজ্জা লজ্জা! তাই মুখে বললাম, “নেহাকে খুন করাইলি সেটা ঠিক আছে, কিন্তু ডাক্তার নাজমুল হুদাকে কেনইবা মারতে গেলি?”
”উপায় ছিল না, কারণ তাকে যে পরিমাণ টাকা দেওয়ার কথা ছিল সেটা না পেয়েই ক্ষেপে গেছিল বাছা! বারবার হুমকি দিচ্ছিল, পুলিশের কাছে সবটা বলে দিবে, তাই বাধ্য হয়েই আমার সাইলেন্ট কিলার তানিকে পাঠিয়ে দেই”
বলেই পাশে দাঁড়ানো আমাদের কিডন্যাপকারীর বাহুতে মৃদু চাপ দিল। বুঝতে বাকি রইল না তার নাম যে তানি আর সে আসলেই কতটা চৌকশ! কারণ সে ইতোমধ্যে একবার আমাদের গাড়িতে নিঃশব্দে উঠে তার সেই পরিচয় দিয়েছে।
“আর পুলিশ কনস্টেবল?”
“তাকে না মারলে তুই নিধিকে সন্দেহ করতি। তারপর কনস্টেবলকে তার কাজের জন্য ইন্টারোগেশন সেল পর্যন্ত তুই নিয়ে যেতি, শেষে ও শালা মুখ খুলত আর আমাদের পুঙ্গা বাজত। তাই তাকেও...”
“তারমানে বাইকের জিডি ভুয়া ছিল, যা তোরা পরে করিয়েছিস?”
“হ্যাঁ, কে জানত তুই আবার বাইক নিয়ে পড়ে থাকবি। আর বাইকটা যার ছিল সেও আমাদের দলেরই সদস্য। তাই বাধ্য হয়েই ব্যাকডেইটে জিডি করাতে হয়, কিন্তু সেখানেও তুই বুঝে যাস আর এই বেশি বোঝার জন্যেই শেষমেষ তোকেও মরতে হচ্ছে!”
“ওয়েল, মরতে তো হবেই দুদিন আগে কি পরে, এতে ভাবাভাবির কিছু নেই। কিন্তু তুই আমাকে নিধির মাধ্যমে অনেক আগেই খুন করতি পারতি, তাহলে এত দেরি করলি কেন?”
“আমার ইচ্ছে ছিল তোকে সামনে থেকে কুকুরের মতো নৃশংসভাবে মারার। সাথে এটাও বুঝিয়ে দিতে, কে আসল কিং?”
“তাহলে নেহার বাসার সামনে কিলার লেলিয়ে দেওয়ার হেতু?”
“সেদিনও তোকে কিডন্যাপ করার প্ল্যানই ছিল, কিন্তু তুই ভাগ্যক্রমে বেঁচে ফিরিস।”
“আজ তাহলে আমার দুর্ভাগ্য! কী আর করার? কিন্তু অর্পির বাসায় বোম ব্লাস্ট করার কারণ কি?”
”ওর বাসাতে আগেই আমার হিডেন ক্যামেরা সেট করা ছিল, যেটা দেখেই তোকে অল্প ধামাকা দিয়ে আমার ক্ষমতার আঁচ দেই।”
“তারমানে আমি অর্পিকে কাঁধে তুলে দৌড় দিলেই বুঝে যাস, আমরা কিছু একটা সন্দেহ করেই বেরিয়ে যাচ্ছি?”
“একদম, মানতেই হবে বস, ইউ আর জিনিয়াস বাট আজকে আমার খেলার অনুকুলে মাঠ! হে হে...”
“সময় বলে দিবে! এখন বল আমার গাড়িতে ট্র্যাকার কখন লাগাইছিলি, অর্পির বাসার নিচে গাড়ি থাকা অবস্থায় নাকি অফিসের নিচে?”
“অর্পির বাসা, কিন্তু তুই কেমনে বুঝলি?”
“সিম্পল, কারণ এছাড়া তোর সাইলেন্ট কিলার তানি কখনোই আমাদের ফলো করতে পারত না!”
“ও সরি, আমি তো ভুলেই যাই যে আমার সামনে মি. ব্রিলিয়ান্ট রাজ বসে আছে! হা হা...”
“হেসে নে যত পারিস, কারণ সামনে কেঁদে কূল পাবি না!”
কথাটা বিড়বিড় করে বললেও তুর্য শুনতে পায়, তাই রাগান্বিত হয়ে নিজের হোলস্টারের পিস্তল বাম হাতে ছুঁয়ে উচ্চস্বরে বলল, “তেজ কমেনি এখনো? তোরা সবকটা আমার হাতে বন্দী হয়ে আছিস, কেনো ভুলে যাস এটা? আর এখন কুকুরের মতোই পিষে মারব তোদের একেকটাকে! তারপর দেখ কে হাসে আর কে কাঁদে?”
“ঠিক আছে, তাহলে নিধিকেই বল গুলি করতে একদম হৃদপিণ্ড বরাবর। তবে আমার মনে হয় না ও পারবে, কেনো যেনো ওর চোখে আমার প্রতি ভালোবাসা দেখতে পাচ্ছি!”
কথাটা বলার মূখ্য উদ্দেশ্য, তুর্যের হাতে যেন পিস্তল উঠে না আসে আর ওদের দুজনের মধ্যে গণ্ডগোল পাকিয়ে ফায়দা নেওয়া। এই প্ল্যান কতটা কাজে দিবে জানি না, তবে হঠাৎ নিধির পিস্তল ধরা হাত কেঁপে উঠতে দেখলাম। তুর্য, ওর দিকে তাকিয়ে বলল, “গো বেবি, তোমার আশিকের শেষ ইচ্ছেটা পূরণ করে দাও।”
নিধি পিস্তল উঁচিয়ে আমার দিকে আসতে থাকল। ভয়ে আমার গলা শুকিয়ে কাঠ, তারমানে আজই শেষদিন? অজান্তেই চোখ বন্ধ হয়ে গেছে। মানসপটে কত স্মৃতি ভেসে বেড়াতে লাগল, বিশেষ করে নিধির সাথে সুন্দর মুহূর্তগুলো। হঠাৎ মাথার পেছনে পিস্তলের নল ছোঁয়ায় চোখ খুলে তাকিয়ে দেখি তুর্য মিটিমিটি হাসছে। তারমানে নিধি আমার পেছনে দাঁড়িয়ে ট্রিগারে আঙ্গুল দিয়ে তুর্যের আদেশের অপেক্ষায়!
“ভয় করছে এতকাছে মৃত্যুকে দেখে?”
তুর্যর কথার জবাব না দিয়ে আমি ভাবতে থাকলাম, আমার বাঁচার শেষ ইচ্ছেটাকে যেভাবেই হোক কাজে লাগাতে হবে। কারণ নিধিকে সামনে থেকে গুলি করতে বলে ওর চোখে চোখ রেখে প্রশ্ন করতে চাই, “কী দরকার ছিল এত আয়োজনের- মিথ্যে মায়ায় জড়ানোর, আমাকে বললে এমনিতেই জানটা বের করে দিতাম!”
তাহলে হয়ত একটা চান্স থাকবে ওকে জালে ফাঁসনোর, ওর মতোই মায়ায় জড়িয়ে কিছু একটা করার! কিন্তু মনে হয় না কাজে দিবে, কারণ এরা মানুষ নেই- অনেক আগেই অমানুষ হয়ে গেছে। হয়ত জন্মের পর থেকেই মানুষের ঘৃণা ও লাথি খেয়ে বড়ো হয়েছে। এমনকি পিতামাতার পরিচয়ও জানে না। ভালোবাসা বলতে এরা বুঝে খুন করা, অন্যের রক্ত নিয়ে খেলা করা, নিজের ক্ষমতা জাহির করা!
হঠাৎ গুলির শব্দে আমার ভাবনা ও বেঁচে থাকার আশাটা শেষ হয়ে গেল, এই বুঝি আমি মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়লাম। সময় বয়ে চলছে কিন্তু আমার কোনো অনুভূতি হচ্ছে না কেনো, শরীরের কোথাও কোনো ব্যথা পাচ্ছি না কেন? পরক্ষণেই নিধির চিৎকারের শব্দে আমার ধ্যান ভাঙল, “মি. ডেভিল, কোনোরকম নড়াচড়া করলেই পরের গুলিটা তোমার বুক ভেদ করবে!”
সামনে তাকিয়ে দেখি লেডি বাইকার ফ্লোরে পড়ে আছে। আর তুর্য, ওরফে আন্ডারওয়ার্ল্ডের মি. ডেভিল হতবিহ্বল হয়ে আমাদের দিকে তাকিয়ে আছে। তারমানে নিধির অভিনয় শুধু অভিনয় নয়, ভালোবাসাও মিশ্রিত ছিল।
তারপর হঠাৎ গর্জে উঠে আরো একটি অস্ত্র। আমি তুর্যর দিকে তাকিয়ে থাকাতে লক্ষ্য করিনি, ওটা যে সাইলেন্ট কিলারের পিস্তল থেকে আসা গুলি। শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করার আগে তার বসের জন্য কিছু একটা করে গেল সে। এদিকে আমাকে বাঁচাতে নিধির গায়ে গুলি লাগে। কারণ ও আমার পেছনে দাড়ানো ছিল আর আমি ওর সামনে চেয়ারে বসা ও রশি দিয়ে বাঁধা। ওর পিস্তল ছিল তুর্যর দিকে তাক করা তাই সাইলেন্ট কিলারের গুলি ঠেকাতে দ্রুত গুলি করতে না পারলেও বাম হাত দিয়ে আমার চেয়ার পেছন দিকে টেনে ফ্লোরে ফেলে দেয়। আর গুলি এসে সরাসরি ওর পেটে লাগে। তারমানে কিলার আমার মাথা লক্ষ্য করেই গুলি করেছিল। পেট ধরে নিধি বসে গেছে, রক্তে ভেসে যাচ্ছে ফ্লোর, এমনকি আমার শরীরও। ওকে বাঁচাতে হলে দ্রুত ব্লিডিং বন্ধ করতে হবে, কিন্তু কোনো উপায় নেই!
“ও রিয়েলি তোরা লাভ বার্ডস! সেজন্যই তো বলি, ওর ফোনে কন্ট্যাক্ট কিলিং মেসেজ পাঠানোর পরও কেনো তুই নিধিকে সন্দেহ করিসনি!”
চেয়ারসহ চিৎ হয়ে শুয়ে মাথার ওপর তুর্যর মুখ দেখতে পেলাম। ইচ্ছে করছে ঘুসি মেরে ওর নাকমুখ ভোঁতা করে দিতে।
“তোর নিশ্চয়ই জানতে ইচ্ছে করছে, মেসেজ কেন পাঠিয়েছিলাম? আসলেই তোকে পরীক্ষা করতে তুই কতটা ভালোবাসিস ওকে বা বিশ্বাস করিস? যদিও তুই পাশ করিস কিন্তু নিধিকে নিয়েও সন্দেহ হচ্ছিল, তাই তো ওকে দিয়েই তোর মাকে কিডন্যাপ করিয়ে বোমা লাগিয়ে প্রমাণ করিয়ে নিই ও কতটা ভরসার! কিন্তু আজকে হঠাৎ ওর কি হল, তোকে দেখেই ভালোবাসা উথলে ওঠল!”
তারপর আরো কিছু বিশ্রী গালি দিয়ে নিধিকে একের পর এক লাথি মারল পেট বরাবর। ও সিঁটকে পড়ে গেল ফ্লোরে আর ফিনকি দিয়ে রক্ত বের হতে লাগল। মেয়েটির বাঁচার আশা শেষ হয়ে গেল বুঝি! তারপরেই আমার দিকে এগিয়ে এসে এলোপাতাড়ি লাথি মারতে থাকল। হাতা পা বাঁধা থাকায় ঠেকানোর উপায় নেই। কয়েক সেকেন্ডের মধ্যেই চোখে সর্ষেফুল দেখতে আরম্ভ করলাম। নাক মুখ দিয়ে যে ইতোমধ্যে রক্ত বের হচ্ছে সেটা অবচেতন মনেও টের পেলাম। গুলি করার প্রয়োজন আর হবে না, এমনিতেই রক্ত বের হয়ে মারা যাব বুঝি। মরা নিয়ে আফসোস নেই কিন্তু নিধির জন্য কিছুই করতে পারলাম বলে বড্ড আফসোস হতে লাগল।
ঠিক তখনই দরজার পাশে একটা ভারী কণ্ঠ ভেসে এলো, “হল্ট মি. ডেভিল, নয়ত এবার তোর পেটে গুলির চাষ হবে!”
বাকিটা আর শুনতে পারলাম না, তার আগেই জ্ঞান হারালাম।
...
তারপর যখন জ্ঞান ফিরে পেলাম তখন নিজেকে হাসপাতালের বেডে আবিস্কার করলাম। মর্গ নাকি রোগির ওয়ার্ড দেখার জন্য ডানে বামে তাকাতেই মা, অর্পি, সুপ্তিকে দেখতে পেলাম। মনটা হু হু করে কেঁদে ওঠল, মনের অজান্তেই নিধির জন্য অশ্রু বেয়ে পড়ল। আমার অবস্থা দেখে মা বলে ওঠল, “তুই তো আমার বৌমার থেকেও ডরপোক দেখি, সে গুলি খেয়েও তোর আগে জ্ঞান ফিরে পেয়েছে আর তুই কিনা!”
আম্মুর কথা শুনে রুমের সবাই খিক খিক করে হেসে লুটিপুটি খেলো। আমিও খুশিতে ভেতরে ভেতরে নেচে ওঠলাম। মুখে শুধু বললাম, “ওর কেবিন কোনটা?”
“আইসিউতে আছে। গুলি লাগাতে অনেক ব্লিডিং হয়েছে মেয়েটার, তাই ঘুমের ইনজেকশন দিয়ে অবজার্ভেশনে রেখেছেন ডাক্তার। কাল সকালের আগে কথা বলতে পারবি না!”
“এখন কয়টা বাজে?”
“রাত নয়টা।”
...
তারপর জানতে পারি, নিধি গুলিবিদ্ধ অবস্থায়ই মা ও সুপ্তিকে কোথায় আটকে রেখেছে সেই ঠিকানা দেয়। এমনকি বোমাও নাকি ফিউজ ছিল সেও তথ্য দেয়। ছ্যাঃ আর আমি কয়টা লাথি খেয়েই বেহুঁশ, দিন দুনিয়ার হুঁশ ছিল না। এইটা নিয়ে আম্মু ও মালা যে আমাকে অনেকদিন পঁচাবে এটা নিশ্চিত। এছাড়াও তাদের দলে তো আরেকজন যোগ হতে চলছে!
আর হ্যাঁ, সুপ্তির জোন কমান্ডারই আমাদের তুর্যর হাত থেকে বাঁচিয়ে উদ্ধার করেন। তাঁর সাথে আমিই সাক্ষাৎ করি যেদিন বোম ব্লাস্ট হয় সেই রাতে। অর্পিকে আমার অফিসে শুইয়ে দিয়ে তাকে ফোন করে দেখা করি। তুর্য সম্পর্কে সব তথ্য পেয়ে এবং আমার প্ল্যান শুনে রাজি হয়ে যান। সাথে এটাও বলেন, আমি যেন হিডেন মাইক্রো ক্যামেরা বহন করি-সাথে লোকেশন ট্র্যাকার, যাতে ওনারা সব শুনতে পান ও আমাদের সহজেই খুঁজে উদ্ধার করতে পারেন।
আর হ্যাঁ, ওনাকে তখনই সন্দেহের লিস্ট থেকে বাদ দেই যখন অর্পি আমার অফিসে ঘুমের ঘোরে সুপ্তির বলা মেসেজ আওড়ায়!
“নিহাল তোর বড়োই বিপদ, তোকে তুর্য খুন করার প্ল্যান করেছে। সুপ্তি গোপন মিশনে আছে, ও জানতে পেরেছে তোর...!”
ঠিক তখনই আমি জেনিকে সুপ্তি ভেবে নিই আর এটাও ভাবি যে, জেনি আমাকে বাঁচানোর জন্যই বিষয়টা হয়ত শেয়ার করেনি। একা একা আমাকে বাঁচাতে গিয়ে নিজেই তুর্যর হাতে বন্দী হয়ে গেছে!
অবশ্য অর্পি আমাকে বিষয়টা আগেই জানাতে পারত কিংবা আমার খোঁজ নিতে পারত কিন্তু শালী দেশে এসেই অতিরিক্ত চাপ সহ্য করতে না পেরে মদ্যপান করে সব ভুলে হুঁশ হারিয়ে ফ্ল্যাটে বুঁদ হয়ে পড়ে থাকে। সেজন্য ওকে প্রচুর গালিও শুনতে হলো আমার থেকে!
...
এসবি ও পুলিশ মিলে তুর্যের পুরো নেটওয়ার্ক কব্জা করে নেয়। আপাতত শাকিল শুধু ধরাছোঁয়ার বাইরে আছে, ওর খোঁজ কেউ পায়নি। বাকিদের নামে মামলা করা হয়েছে, ধীরে ধীরে বিচার কার্য পরিচালনা করা হচ্ছে।
আজ শুনানি ছিল, রাজ সাক্ষী নিধি ও সুপ্তি। ওর জন্য আমাকেও কোর্টে আসতে হলো। শুনানি শেষে আদালত ত্যাগ করার আগে বললাম, “থ্যাংকস নিধি!”
“কেনো!”
সেই ভুবন জয়ী হাসি হেসে বলতেই বুকের ভেতর পুলকিত অনুভব করলাম। আহা কী মিষ্টি অনুভূতি। ভালোবাসা সত্যিই সুখকর ও মুগ্ধতায় ভরা, শুধু সঠিক মানুষ পাওয়াটা ভাগ্যের ব্যাপার।
“এই যে তুমি শাকিলকে খুঁজে বের করতে সাহায্য করলে আর নেহাকে কষ্ট দেওয়ার প্রতিশোধ নিতে দিলে। ওকে নিজ হাতে শাস্তি দিতে না পারলে আজীবন এই আফসোস বয়ে বেড়াতে লাগত, সাথে কিছু প্রশ্ন অজানায় থেকে যেতো, হয়ত নেহার আত্মাও অতৃপ্ত থাকত। তোমাকে পেয়ে সত্যিই আমি ধন্য, ভালোবাসি খুউব!”
“আমিও আপনাকে ছাড়া অপূর্ণ, ভালোবাসি- ভালোবাসি- ভালোবাসি। কিন্তু শাকিলকে কী করলেন?”
আমি মুচকি হেসে ডান হাতে ওকে কাছে টেনে নিয়ে বললাম, “ওসব বড়োদের কাজ তোমাকে জানতে নেই, তুমি শুধু আমাকে ভালোবাসা দিও।”
“আর আপনি আমাকে তাড়াতাড়ি টুইন বেবির মাম্মা করে দেন!”
সাথে সেই রহস্যময় হাসি, যা আমাকে প্রতিনিয়ত সম্মোহিত করে। হৃদয় প্রকোষ্ঠে ভালোবাসার জাল বুনে আর সুখের আবেশে ভাসিয়ে নিয়ে চলে দূর থেকে বহুদূর! তবে দুঃখ একটাই ওর থেকে তুমি ডাক শোনা হবে না কখনোই, কারণ ওর নাকি আপনি-স্যার এসবেই সুখানুভূতি মেলে। পাগলি একটা!
আর হ্যাঁ, ও কিন্তু সত্যি সত্যিই জাদু জানে, নয়ত এত দ্রুত শাকিলকে খুঁজে বের করল কেমনে! তারপর ঢাকার অদূরে প্রায় পাঁচ একরের একটা খামার বাড়ির মালিক হলো কেমনে! যেখানে এখন আমরা সবাই শিফট হয়ে গেছি। আর হ্যাঁ, এই খামারের ভেতরে গোরু, ছাগল, হাঁস- মুরগি ও মাছের পাশাপাশি কুমিরও চাষ করা হচ্ছে, সেই কুমিরেরই খাবারে রূপান্তরিত করা হয়েছে শাকিলকে, যা আমি ছাড়া আর কেউ জানে না!
এতকিছু করার পরও নিধি বারবার ক্ষমা চেয়েছে, চোখের পানিতে বুক ভাসিয়েছে। যদিও এসব নিয়ে আমরা আর কখনোই কথা তুলিনি, কিন্তু ওর অনুতপ্তের শেষ নেই। ওর কথা থেকে একটা বিষয় স্পষ্ট, ও অনাথ জীবনে কারো থেকে কখনোই স্নেহ, ভালোবাসা পায়নি, যা ওকে হিংস্র করে তোলেছিল। পুরুষ শাসিত সমাজে তাদের লোলুপ দৃষ্টি ওকে নিষ্ঠুর খুনি বানিয়েছিল।
আর হ্যাঁ, ও কিন্তু সুপ্তির বাসার অপজিটেই থাকত। ওখান থেকেই সুপ্তির গতিবিধি পর্যবেক্ষণ করত, মাফিয়া ডনের আদেশে। এমনকি তার বাসায় হিডেন ওয়েবক্যাম সেট করা, ল্যাপটপ থেকে এসবির মেইল একাউন্ট হ্যাক করা, সবকিছুই নিখুঁতভাবে করেছিল। তাই তো আমি সেদিন ওকেই এসবির এজেন্ট ভেবেছিলাম, সাথে পুলিশ এসআই। মূলত ওটা ছিল সুপ্তি, ওরফে জেনির বায়োডাটা।
তারপরই ও আমার অফিসে যোগ দেয়, কারণ সুপ্তির ওপর নজরদারি করতে গিয়ে তুর্য জেনে যায় ও অর্পির বোন। সেজন্য নিধিকে জেনি পরিচয়ে আমার অফিসে পাঠিয়ে দেয়, পরবর্তীতে আমাকে পাকড়াও করতে। তাছাড়া প্ল্যান এমনভাবে সাজিয়েছিল, যাতে আমি জোন কমান্ডারকে ভুল বুঝে একটা পদক্ষেপ নিই আর ফেঁসে যাই।
নিধিকে জিজ্ঞেস করেছিলাম, ও কেনো এসব আমাকে আগে বলে ওয়ার্ন করেনি, যেহেতু ও আমাকে ভালোবাসত। পরে জানায় এসব ভালোবাসা ও শ্রদ্ধা সবই অভিনয় ছিল, কিন্তু একদম শেষে এসে মায়ের ভালোবাসা ও আমার ব্যবহার ওকে বদলে দেয়, একটা সংসার সাজানোর স্বপ্ন দেখায় কিন্তু ততক্ষণে ওর হাতে সময় থাকে না। তাছাড়া ও চেয়েছিল আমাকে এসবে না জড়িয়েই নিজে থেকে তুর্যকে শেষ করে আমাকে বাঁচাতে।
সবচেয়ে মজার ব্যাপার হলো, নিধির বাবা হিসেবে যাকে আমি চিনতাম, সে আদতে মাফিয়া সদস্য। তার মাধ্যমেই সব খবর যেতো তুর্যর নিকট, মানে সরাসরি কোনো সদস্য মি. ডেভিলের সাথে যোগাযোগ করতে পারত না। বেশ কয়েকবার নিধির সাথে লোকটির দেখা হলে আমি একদিন জিজ্ঞেস করতেই ঝটপট জানিয়ে দেয়, ওনি ওর বাবা। কী ট্যালেন্টেড! পরবর্তী লোকটির সাথে যাতে ওকে দেখলে আর ভুল না বুঝি। তারপর থেকেই লোকটি যখন তখন আমাদের অফিসেও চলে আসত, চা নাস্তা খেয়ে যেতো, তথ্য সংগ্রহ করত অথচ আমরা ঘুনাক্ষরেও টের পাইনি!
“এই কী ভাবতেছ আবার?”
নিধির কথায় কল্পনা থেকে বেরিয়ে এসে বললাম, “না, কিছু না। চলো এবার খামারে ফেরা যাক। অনেকটা সময় পেরিয়ে গেছে, পশু পাখিদের খাবার দেওয়া হয়নি। ওদিকে মা ও মালাও হয়ত টেনশন করছে।”
“হুম, তাই চলো।”
অতঃপর দুজন দুজনের হাত ধরে হেঁটে এসে গাড়িতে চেপে বসলাম। নিধিই স্লো ড্রাইভ করছে আর আমি ওর পানে তাকিয়ে থেকে মুগ্ধ, বিভোর হলাম! ভালোবাসা সত্যিই সুন্দর!
....#সমাপ্ত....
Comments
Post a Comment