প্রতীক্ষার অবসান ঘটিয়ে পর্যালোচনা
বিছানার উপর ফাইলটা দেখতে পেয়ে দুশ্চিন্তাটা দূর হলো । ভেবেছিলাম হয়ত কোথাও হারিয়ে ফেলেছি । যাক বাঁচা গেলো । এরপর অফিস ব্যাগ থেকে তেঁতুলের আচারটা বের করে টেবিলের উপর রাখতে যাব এমন সময়.....
- মেয়েটা কে ছিল ?
কথাটা শোনামাত্র পিছনে ঘুরে তাকিয়ে দেখি পিয়ালি দাঁড়িয়ে আছেন খুবই গম্ভীর মুখ নিয়ে । একটু আগে দরজা খোলার সময়ও তাকে দেখে অন্যরকম লাগছিলো কিন্তু এমন প্রশ্ন করার কারণটা ঠিক বুঝতে পারলাম না । তাই জিজ্ঞেস করলাম.....
- জ্বী, কার কথা বললেন ?
পিয়ালি গলার স্বরটা খানিকটা তীক্ষ্ণ করে বললেন.....
- আজ দুপুরে আপনার অফিসের পাশের রেস্টুরেন্টে একটি মেয়ের সাথে বসা ছিলেন, সে কে ?
কথাটা শুনে এক প্রকার চমকে উঠলাম, সেই সাথে অনেকগুলো প্রশ্নও মাথায় ঘুরতে শুরু লাগলো ।
- আপনি কি করে জানলেন ? কে বলেছে আপনাকে ?
পিয়ালি মুখের চোয়ালটা শক্ত করে বললেন.....
- আমি আমার নিজ চোখে দেখেছি ।
- কি! আপনি ছিলেন ওখানে । কই আমিতো.....
কথাটা সম্পূর্ণ হতে না দিয়ে পিয়ালি আবার বলে উঠলেন.....
- যেটা জিজ্ঞেস করছি সেটা আগে বলেন ? ঐ মেয়েটা কে ?
- আমিতো তাকে চিনিনা ।
- চিনিনা মানে ? তার সাথে আপনার কি সম্পর্ক ?
- কোনো সম্পর্ক নেই বরং আমি তার নাম পর্যন্ত জানিনা ।
- একটা মেয়ের সাথে একা একটি রেস্টুরেন্টে বসে হাতে হাত রেখে কথার ফুলঝুরি ফোটাতে পারেন কিন্তু তার নাম জানেন না । এটা কোন ধরণের ফাজলামো করছেন আমার সাথে ?
শেষ কথাটা এতোটা জোরে শোনালো যে, আমার সারা শরীরের লোম দাঁড়িয়ে গেলো ।
- আমি আপনাকে সত্যি বলছি আমি তাকে চিনিনা ।
- আবার সেই চিনিনা চিনিনা বলে যাচ্ছেন, আর অন্য কোনো অজুহাত কি খুঁজে পাচ্ছেন না নাকি ? না পেলে আমাকে বলেন আমি খুঁজে দেই । যেমন অফিসের কলিগ বা ক্লাসমেট বা আগের বান্ধবী । অন্তত এগুলোর মধ্যে থেকে তো কিছু একটা বলুন যাতে করে মিথ্যে হলেও নিজেকে কিছু একটা বলে বুঝ দিতে পারি ।
পিয়ালিকে এতোটা রাগে কথা বলতে আমি কখনো দেখিনি বরং আমি তাকে কখনো রাগ করতেই দেখিনি । খুবই শান্ত স্বভাবের তিনি কিন্তু আজ মনে হচ্ছে পুরোপুরি অন্য কাউকে দেখছি । পিয়ালি রাগের মাত্রাটা চূড়ান্ত পর্যায়ে নিয়ে গিয়ে বলতে লাগলেন.....
- আপনি যেহেতু কিছু বলেছেন না সেহেতু আমিই বলছি । আজ আপনার আপনার অফিসে যাওয়ার পর ঘর গোছানোর সময় আপনার লাল ফাইলটি নিচে পড়ে থাকতে দেখি । গত দুই দিন যাবৎ আপনাকে রাত জেগে এটার উপর কাজ করতে দেখেছিলাম তাই ফাইলটি দেখামাত্র বুঝতে পারি আপনি ফাইলটি আজ ভুলে ফেলে গিয়েছেন । তাই তাড়াতাড়ি আপনার ফোনে কল দেওয়ার চেষ্টা করি কিন্তু আপনার ফোন বন্ধ দেখায় । এরপর বেশ কিছুক্ষণ অপেক্ষাও করি যে, আপনি হয়তো বাসায় এসে নিয়ে যেতে পারেন সেই আশায় । কিন্তু যখন দেখলাম সেটাও হলোনা তখন ঠিক করলাম আমি নিজে গিয়ে ফাইলটা আপনাকে দিয়ে আসবো । এটা ভাবতে ভাবতে আরো একটা ভাবনা চলে আসলো যে," যাচ্ছিই যখন তাহলে আপনার জন্য দুপুরের খাবারও নিয়ে যাই "। প্রতিদিন তো আপনি লাঞ্চে ঐ বাহিরের ছাইপাঁশ খান, আজকে না-হয় একটু তৃপ্তি নিয়ে বাসার খাবার খেলেন । অতঃপর আপনার ফাইল আর খাবার সঙ্গে নিয়ে সিএনজিতে রওনা হই কিন্তু রাস্তায় অনেক জ্যাম থাকায় পৌঁছাতে বেশ খানিকটা সময় লেগে যায় । এরপর সিএনজি থেকে নেমে অফিসের বিল্ডিংয়ে যেতে নিব এমন সময় অফিসের পাশে থাকা রেস্টুরেন্টের থাই গ্লাসের জানালার ভিতরে চোখ পড়ে । প্রথমে ভেবেছিলাম হয়তো ভুল দেখেছি কিন্তু জানালার একটু কাছে যেতেই পরিষ্কার দেখতে পেলাম আপনি আর একটি মেয়ে একে অপরের হাত ধরে মনোরম গল্প করে যাচ্ছেন । আজ এমন একটা কিছু দেখতে পাব তা হয়তো আমি কল্পনাও করতে পারতাম না । দৃশ্যটি দেখে আমি আর কিছু ভাবতে না পেরে সাথে সাথে বাসায় ফিরে আসি । তাহলে এখনো কি বলবেন আপনি তাকে চিনেন না আর আমি যা আজকে দেখেছি তা ভুল ।
- আপনি আমাকে একটু সময় দিন আমি সবকিছু বুঝিয়ে বলছি ।
- আমাকে আর আপনার কোনোকিছু বোঝানো লাগবে না । আমি ইতিমধ্যেই বুঝে গিয়েছি যে, আপনি অনেক ভালো একজন অভিনেতা । আসলে আমার সাথে আপনার সবই ছিল একটা অভিনয় । এই যেমন সকালে আমার ঘুম ভাঙার আগেই নিজে ঘুম থেকে ওঠে ঘর পরিষ্কার করা, নাস্তা বানানোসহ আরো যাবতীয় কাজ করা, এরপর অফিসে যাবার সময় দরজার সামনে দাঁড়িয়ে,"সাবধানে থাকবেন" কথাটা বলা, অফিসে পৌঁছামাত্র ম্যাসেজ দেওয়া "পৌঁছেছি", দুপুরে নিজে খাবার আগে ফোন করে জানা,"আমি খেয়েছি কি-না", অফিস শেষে ফেরার সময় আরো একবার ফোন দিয়ে বলা "কিছু লাগবে কি", আমি "না" বললেও আমার পছন্দের কিছু না কিছু সঙ্গে করে নিয়ে আসা, আজ যেমন এই তেঁতুলের আচার, এরপর ফ্রেশ হয়ে এসে দুজনের জন্য কড়া করে আপনার সেই প্রিয় লেবু চা বানানো, যেটা এখন আপনার থেকে বেশি আমার প্রিয়, এরপর রাতের খাবার শেষে একা টিভি দেখতে বা গুমাতে চলে না গিয়ে আমার সাথে গল্প করার ছলে কিছু না কিছু কাজ করে কাজের ভারটা কমিয়ে দেওয়া । একজন মেয়ে তার স্বামীর মধ্যে সবথেকে বেশি যে দুটি গুণ আশা করে তা হলো, একটু তার কাজে সহযোগিতা করা আর তার প্রতি দায়িত্বশীল হওয়া । আর আমি এই দুটি গুণের বিন্দুমাত্র কমতি আপনার মধ্যে কখনো খুঁজে পাইনি বরং মাঝে মাঝে অবাক লাগতো যে একজন স্বামী কীভাবে তার স্ত্রীর প্রতি এতোটা যত্নশীল হতে পারেন ।
আমি মুখ হা করে পিয়ালির কথাগুলো শুনছিলান । আসলে বুঝতে পারছিলাম না-যে ওনি আমার দোষ ধরছেন না-কি প্রশংসা করছেন । হঠাৎ খেয়াল করলাম পিয়ালির কণ্ঠে একটু একটু কান্নার আভাস বোঝা যাচ্ছে । তার চোখের দিকে তাকিয়ে দেখি, "হ্যাঁ" চোখ দুটো পানিতে পূর্ণ হয়ে আছে, যেকোনো সময় তা গড়িয়ে পড়বে । পিয়ালি এই অশ্রুভরা চোখ নিয়েই আবার বলতে শুরু করলেন.....
- কিন্তু এখন পরিষ্কারভাবে বুঝতে পাচ্ছি যে, এসবই আপনার অভিনয়ের অংশ ছিল যাতে করে আমি আপনাকে অন্ধভাবে বিশ্বাস করতে শুরু করি আর এই সুযোগে আপনি বাহিরে গিয়ে এমন নোংরামি.....
কথাটা শেষ করার আগেই ফুপিয়ে কাঁদতে লাগলেন পিয়ালি । চার মাস আগে যাকে সারাজীবন সুখে রাখার পণ করেছিলাম ভাবতে পারিনি এতো তাড়াতাড়ি তার চোখ দিয়ে পানি ঝরতে দেখব তা-ও আবার আমার কারণেই । ওনার গাল বেয়ে পড়া প্রতিটা অশ্রু যেনো আমার হৃৎপিণ্ড ছিদ্র করে বেরিয়ে যাচ্ছে । আর সহ্য করতে না পেরে টেবিলে থাকা পানির গ্লাসটা হাতে নিয়ে খানিকটা শাসনের গলায় বললাম.....
- অনেক কথা বলেছেন এখন একটু চুপ করে বসে পানিটা খেয়ে নিন ।
কথাটা শুনে পিয়ালি অশ্রুঝরা চোখে আমার দিকে কিছুক্ষণ তাকিয়ে থেকে আস্তে করে পানির গ্লাসটা নিজের হাতে নিয়ে বিছানার উপর বসলেন । পিয়ালি এখন পুরোপুরি নিরব হয়ে আছেন । চাইলেই এখন তাকে পুরো ঘটনাটির সত্যতা বলে দিতে পারি কিন্তু কেন যেনো মনটা একটু স্বার্থপর হতে চাইলো, আসলে পিয়ালির মনের ভিতরে আমাকে নিয়ে আরো কি কি কথা লুকিয়ে আছে তা জানার খুব ইচ্ছা হচ্ছিল । তাই আমিও নিরব হয়ে রইলাম । একটু পর ওড়না দিয়ে চোখ মুছতে মুছতে খুবই নরম গলায় বলতে লাগলেন.....
- মনে আছে বিয়ের আগে আমাদের দ্বিতীয় দেখায় আমি আপনার কাছে একটা অনুরোধ করেছিলাম । অনুরোধে বলছিলাম, " আমার নতুন পরিবেশ আর মানুষজনের সাথে মানিয়ে নিতে খানিকটা সময় লাগে, তো আপনি যদি আমাকে বিয়ের পর সবকিছুর সাথে মানিয়ে নেওয়ার জন্য কিছুদিন সময় দিতেন তাহলে আমার জন্য অনেক উপকার হতো"। আপনি পরক্ষণেই আমার অনুরোধটি মেনে নেন কিন্তু তারপরও আমার মনের ভিতরে আশঙ্কা থেকেই যায় । আশঙ্কাটা ছিলো যে, এখন মেনে নিলেও বিয়ের পর কয়টা দিনই বা আপনি আমার এই অনুরোধটা রাখতে পারবেন কারণ যতই হোক পুরুষ মানুষ, বলা তো যায়না যেকোনো সময় স্বামীর অধিকার ফলাতে আসবেন । তাই বিয়ের আগে থেকেই উদ্বেগে ছিলাম যে, এই বুঝি আমার মনের আশঙ্কা সত্যি হতে চলেছে । কিন্তু বিয়ের পর আপনি আমার এই আশঙ্কাগুলোকে পুরোপুরি ভুল প্রমাণ করে দেন । স্বামীর অধিকার ফলানো তো দূরের কথা, আমার হাতের সাথে আপনার হাতের ভুলবশত স্পর্শ লেগে গেলেও আপনি প্রায় দুই-তিনবার সরি বলেন । আমার এতোবার মানা করা সত্তেও তা বলেন । এমনকি সামনাসামনি কথা বলার সময়ও এতোটা দূরত্বে দাঁড়িয়ে কথা বলেন যে, মনে হয় আমাদের মাঝখান দিয়ে আরো দুজন মানুষ অনায়াসেই চলে যেতে পারবে । তোমার এসব কর্মকান্ড দেখে মাঝে মাঝে খুব হাঁসি পেত কিন্তু সেই সাথে তোমার প্রতি শ্রদ্ধা আর বিশ্বাসের মাত্রাটাও বাড়িয়ে দিত ।
এক মিনিট, আমি কি ঠিক শুনলাম ? পিয়ালি কি এইমাত্র আমাকে তুমি বলে ডাকলেন ? হ্যাঁ, আমি স্পষ্ট শুনেছি ওনি আমাকে তুমি বলে ডেকেছেন । হৃদস্পন্দন এক মুহূর্তেই যেন কয়েকগুণ বেড়ে গেল । তবে কি গত চার মাস ধরে চলা আমার প্রতীক্ষার পরিণতি কি আজকে পেতে যাচ্ছি ? ভাবতেই মনে একটা অন্যরকম ভালোলাগা কাজ করতে শুরু করলো । যে ভালোলাগাটার স্বপ্ন আমি গত চার মাস যাবৎ দেখে আসছি কিন্তু আজ বাস্তবে তার খানিকটা পরশ পেলাম বলে মনে হলো । এসব ভাবতে গিয়ে ভুলেই গিয়েছিলাম যে, পিয়ালি এখনো কথা বলেই যাচ্ছেন তাই আবার তার কথা শোনায় মনোযোগ দিলাম ।
- তবে কিছুদিন পর থেকে তোমার উপর একটু একটু অভিমানও জন্মাতে থাকে এই দূরত্বের জন্য । একদিন এমনই অভিমান ভরা মনে ভাবছিলাম," বিয়ের এতোদিন পরও সে আমায় আপনি করে ডাকে, সে আপনি ডাকে বলে আমাকেও তাকে আপনি ডাকতে হয় ? অথচ একটু মিষ্টি করে তুমি ডাকলে কি আসে যায় তার"। তখনি বুঝতে পারলাম আমি তোমাকে ভালোবাসতে শুরু করেছি কিন্তু পরমুহূর্তেই মনে হলো এই আপনি বলার পিছনের দূরত্বটা তো আমার জন্যই সৃষ্টি হয়েছে । সেদিন থেকে আজ পর্যন্ত শুধু একটি স্বপ্নই মনে লালন করছি যে, একদিন আমরা আমাদের মাঝের এই দূরত্বটা শেষ করে সত্যিকার অর্থে স্বামী-স্ত্রী হিসেবে সংসার শুরু করব । কিন্তু আজ তুমি আমার এই স্বপ্নটা ভেঙে চুরে শেষ করে ফেললে ।
এতোটুকু বলে পিয়ালি আবার কাঁদতে লাগলেন । এবার আর ওনার কান্না সহ্য করার ক্ষমতা আমার ছিলোনা । তাই নিরাবতা ভেঙে ঘটনাটি বিস্তারিতভাবে বলা শুরু করলাম.....
- আপনি যে রেস্টুরেন্টের কথা বললেন সেখানে আমি প্রতিদিন লাঞ্চ করতে যাই । আজকেও লাঞ্চ করার জন্যই গিয়েছিলাম । কিন্তু আজকে অন্যদিনের তুলনায় ভীড় এতো বেশি ছিল যে বসার কোনো জায়গাই পাচ্ছিলাম না । একটু পর একটি টেবিলের দিকে চোখ পড়লে দেখতে পাই সেখানে শুধু একজন মেয়ে বসে আছেন সাথে আর কেউ নেই । অনেক্ষণ যাবত অপেক্ষার পরও যখন বসার আর কোনো জায়গা পেলাম না তখন বাধ্য হয়ে ঐ টেবিলেই বসে যাই । টেবিলে বসতে বসতে মেয়েটির পাশে একটি বড়সড় ব্যাগ দেখতে পাই । ব্যাগ দেখে মনে হলো হয়তো দূরে কোথাও থেকে এসেছেন বা যাবেন । আর মেয়েটির সামনে এক গ্লাস পানি ছাড়া আর কিছুই নেই । আমি আর বেশি কিছু চিন্তা না করে খাবারের অর্ডার দিতে লাগলাম । এরপর খাবার আসার জন্য অপেক্ষা করছি এমন সময় গোঙানোর শব্দ কানে আসলো । তাকিয়ে দেখি মেয়েটি হালকা হালকা গোঙাচ্ছেন আর রুমাল দিয়ে চোখের পানি মুছছেন । এটা দেখে মানবিকতার স্বার্থে জিজ্ঞেস করি, "আপু কোনো সমস্যা ?" মেয়েটি আমার কথা শুনে হাত দিয়ে বেশ কিছু ইশারা করতে লাগলেন । প্রথমে একটু অদ্ভুত লাগলেও পরে বুঝতে পারলাম মেয়েটি বাকপ্রতিবন্ধী । কিন্তু তিনি ইশারায় কি বোঝাতে চাচ্ছেন তার কিছুই আমি বুঝতে পারলামনা । আর আশেপাশে কোনো কাগজ কলমও নেই যাতে সে লিখতে পারবে । আমাকে বোঝানোর জন্য অনেকভাবে চেষ্টা করতে লাগলেন কিন্তু কোনো কাজ হলোনা অবশেষে তিনি ইশারায় আমার একটি হাত তার দিকে এগিয়ে দিতে বলেন । হাত এগিয়ে দিতেই সে তার একটি আঙ্গুল দিয়ে আমার হাতের তালুতে কিছু লিখে বোঝানোর চেষ্টা করলেন এবং এতে কাজ হলো । এরপর ওনি একটা একটা করে শব্দ আমার তালুতে লিখতে লাগলেন আর আমি সেই শব্দগুলো দেখে বোঝার চেষ্টা করতে লাগলাম যে ওনি আসলে কি বলতে চাচ্ছেন। এর মাধ্যমে বুঝতে পারলাম মেয়েটি গ্রাম থেকে প্রথনবার ঢাকায় এসেছেন তার ভাইয়ের বাসায় যাবেন বলে । কিন্তু ট্রেনে আসার সময় তার কাঁধ ব্যাগটি চুরি হয়ে যায় । ব্যাগে তার ভাইয়ের বাসার ঠিকানা, টাকা এবং একটি মোবাইল ফোন ছিল । ট্রেন থেকে নেমে অনেকের কাছে সাহায্য চেয়েছেন কিন্তু কেউ তার ইশারায় বলা কথা বুঝতে পারেনি বিধায় কোনো সাহায্য করতে পারেনি । বহু কষ্টে ব্যাগ নিয়ে হাঁটতে হাঁটতে এই রেস্টুরেন্ট পর্যন্ত এসেছেন । এরপর কি করবেন তা বুঝতে না পেরে এই রেস্টুরেন্টের সামনেই দাঁড়িয়ে থাকেন । এই প্রখর রোদে একা বাহিরে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে রেস্টুরেন্ট মালিক তাকে ভিতরে এসে বসতে বলেন,খাবারও দিতে চান কিন্তু তিনি না করেন । সেই থেকে প্রায় দু-ঘন্টা হয়ে গেছে ওনি এখানেই বসে আছেন । এরপর তিনি তার ভাইয়ের ফোন নাম্বার লিখতে লাগলেন । লিখা শেষ হলে আমি নাম্বারটিতে ফোন করে তার ভাইকে যাবতীয় সবকিছু খুলে বলি আর রেস্টুরেন্টের ঠিকানাও দিয়ে দেই । প্রায় আধ ঘন্টা পর তার ভাই সেখানে এসে তাকে নিয়ে যান । এটাই ছিল মূলত ঘটনা আর এখনো যদি আপনার মনে বিন্দুমাত্র সন্দেহ থাকে তাহলে আমার ফোনে এখনো মেয়েটির ভাইয়ের নাম্বার আছে চাইলে ফোন করতে পারেন ।
আমার বলা শেষ হলে পিয়ালি তার মাথাটা নিচু করে ফ্লোরের দিকে তাকিয়ে রইলেন আর চোখ দিয়ে অঝোরে পানি পড়তে লাগলো । তা দেখে আমি তার সামনে গিয়ে হাঁটু গেড়ে বসে তার হাত দুটো আমার দু'হাতের মুটোয় নিলাম । আমার এমন আকস্মিক কান্ডে পিয়ালি মাথা উঠিয়ে আমার দিকে তাকালেন । আর আমি তার দিকে তাকিয়ে বললাম.....
- আজ আর ভুলবশত না বরং নিজ ইচ্ছায় আপনার হাত দুটো স্পর্শ করেছি । যেদিন আপনি আমার কাছে সেই অনুরোধটি করেছিলেন সেদিন আমি আপনার জন্য না বরং নিজের জন্য সেই অনুরোধটি মেনে নিয়েছিলাম কারণ আমারো নতুন মানুষদের সাথে মিশতে সমস্যা হতো বিশেষ করে মেয়েদের সাথে । তাই ভেবেছিলাম আপনার এই অনুরোধের উসিলায় আমিও কিছুটা সময় পাবো আপনাকে জানার জন্য কিন্তু বিয়ের দিন আপনাকে কনের সাঁজে দেখামাত্র আপনার প্রেমে পড়ে যাই । আর ঠিক তখন থেকেই আপনাকে নিয়ে স্বপ্ন বুনে যাচ্ছি । এখন আপনিই বলেন যার সব স্বপ্ন আপনাকে ঘিরে বোনা, সে কি করে আপনার স্বপ্ন ভেঙে ফেলতে পারে । আপনি আমার কাছে.....
কথাটা বলার মাঝেই পিয়ালি আমাকে শক্ত করে জড়িয়ে ধরে কানের কাছে মুখ নিয়ে কান্নাভেজা কণ্ঠে বললেন.....
- এখন থেকে আর আপনি নয় শুধু তুমি । কি মনে থাকবে ?
এর উত্তরে আমি পিয়ালির দিকে তাকিয়ে শুধু মাথাটা নাড়ালাম আর উত্তরটা পেয়ে পিয়ালি আস্তে করে আমার বুকের মাঝে তার মাথাটা গুঁজে দিলেন ।
(সমাপ্তি)
গল্প : প্রতিক্ষা
লিখা : মোঃ আসিবুল হক
Comments
Post a Comment