পুরনো সেই দিনের কথা
সকাল থেকেই আজ অজস্র ফোন এসে চলেছে | প্রথমা প্রথম দিকে প্রচুর ফোন ধরলেও এখন সে বেশ ক্লান্ত বোধ করছে | হঠাৎ করে বিখ্যাত হয়ে গেলে কী এতো তাড়াতাড়িই ক্লান্তি চলে আসে শরীরে ?? কিন্তু এই খ্যাতিটুকুর জন্যই তো এতো বছর ধরে লড়াই করে গেছে সে, নিশ্চুপে, নিঃশব্দে | তবুও কাল রাতে সুখবরটা শুনে যতটা আনন্দ পেয়েছিলো, আজ দুপুরের মধ্যেই মনে হোলো, সব আনন্দ যেন আস্তে আস্তে ফিকে হয়ে গেছে | ক্লান্ত হয়ে গেছে কান, ক্লান্ত হয়ে গেছে মন সবার কাছ থেকে শুভেচ্ছা বার্তা শুনতে শুনতে |
দুপুরের খাওয়া শেষ করে বিছানায় একটু হেলান দিলো প্রথমা | দিতি বলল, "মা, তুমি একটু ঘুমোনোর চেষ্টা করো | মোবাইলটা না হয় মিউট করে রেখে দাও | "
প্রথমা বললেন, "সেটা করলে খারাপ হবে রে দিতি | মুহূর্তে দেখবি, সবাই কেমন আমাকে "দেমাকী" ভাবতে শুরু করবে | আজ অন্ততঃ সবার ফোনটা রিসিভ করতেই হবে | "
দিতি বলল, "তাহলে ফোনটা আমার কাছে দাও, যদি কোনো ফোন আসে তাহলে আমি রিসিভ করবো | তুমি একটু ঘুমোনোর চেষ্টা করো দেখি |"
দিতি ফোনটা নিয়ে ঘর থেকে বের হয়ে গেলো | মেয়েটা কেমন যেন দেখতে দেখতে কত বড়ো হয়ে গেছে | শখ করে মেয়ের নাম রেখেছিলো, "অদ্বিতীয়া" |
অলোক খুব হেসেছিলো এমন নাম দেওয়াতে | বলেছিল, "তুমি কী ভেবেছো প্রথমা, অদ্বিতীয়া নাম রাখলেই তোমার মেয়ে প্রথম হয়ে যাবে সব কিছুতে ?? নাম রাখলেই সব কিছু হয় না প্রথমা, তাহলে তুমিও সব বিষয়ে প্রথম হতে | তাই নয় কী ?? অথচ দেখো, তুমি আসলে এমন কিছুই নয় | উচ্চমাধ্যমিকে ফেল করেও কিভাবে মাস্টার্স হয়ে গেলে | নেহাত কপাল জোরে বাবার চাকরিটা পেয়ে গেলে তাই | ওসব নাম রাখো আর না রাখো, যে প্রথম হওয়ার সে এমনিই হয়, নাম রাখলেও হয়, না রাখলেও হয় |"
প্রথমা একটু একটু করে হারিয়ে যায় স্মৃতির অতলে | তার নামটা প্রথমা রাখা হয়েছিল সে জীবনে সর্বক্ষেত্রে প্রথম হবে বলে নয় | এই নামটা রেখেছিলেন তার দাদু | বংশে নাতি নাতনিদের মধ্যে সেই ছিল প্রথম | তাই দাদু ভালোবেসে এমন নাম দিয়েছিলেন |
কিন্তু সেই নামটাই সারাজীবন প্রথমার গলার কাঁটা হয়ে গেলো | লেখা পড়ায় খুব ভালো ছিল না প্রথমা, কিন্তু রবীন্দ্রনাথ, শরৎচন্দ্র, বনফুল পড়তে খুব ভালো লাগতো তার | বই পড়ার অভ্যেস থাকার ফলে কলমও ধরেছিলো খুব তাড়াতাড়ি | ক্লাস সিক্স, সেভেন থেকেই পোক্ত ভাষাজ্ঞান তার তৈরী হয়ে গিয়েছিলো | বাংলা দিদিমনির প্রিয় পাত্রী থাকলেও অন্যান্য দিদিমনিরা খুব ব্যঙ্গ করতেন প্রথমাকে | কখনো ক্লাসে পড়া না পারলে দিদিমনিরা ব্যঙ্গ করে বলতেন, " শুধু মন গড়া গল্প লিখলেই হবে কী প্রথমা ?? একটু পড়াশোনাটাও তো করতে হবে | নিজের নামটাকে সার্থক না করতে পারলেও অন্ততঃ লজ্জা দিও না | রেজাল্ট খারাপ হলে এইসব লেখা তোমার ক্যরিয়ার তৈরী করে দেবে না | "
দিদিমণিদের কথায় মনে কষ্ট পেলেও চুপ করে থাকতো প্রথমা | বাংলা দিদিমণি শুধুমাত্র কাছে ডেকে বলতেন, "প্রথমা, এই লেখার গুণ সবার থাকে না | এটা ঈশ্বর প্রদত্ত প্রতিভা | অতএব, যে যাই বলুক,, নিজের লেখাকে কখনো অমর্যাদা করবে না | তোমার মতো লেখা অনেক শিক্ষিত মাস্টারমশাই, দিদিমণিরাও লিখতে পারবেন না | লিখতে গেলে লাগে অনুভূতি, কল্পনা আর শব্দচয়নবোধ, সেটা শুধু ঈশ্বরের আশীর্বাদেই পাওয়া যায় | অতএব, নিজের থেকে কখনো হার স্বীকার করবে না, সে জগৎ সংসার যতই তোমায় হারিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করুক না কেন | "
মাধ্যমিকে ফার্স্ট ডিভিশনে পাশ করার পরে রেজাল্ট আনতে যাওয়ার দিনে বাংলা দিদিমণি প্রথমার বাবাকে বিশেষভাবে অনুরোধ করেছিলেন, "ওকে বাংলা নিয়ে পড়াশোনা করতে দিন | ওই বিষয়ে ওর সাবলীলতা অসীম, প্রথমা উন্নতি করবে জীবনে | "
প্রথমার বাবা সেই মুহূর্তে "দেখছি" বললেও নিজের স্কুলে মেয়েকে ভর্তি করিয়ে দিলেন অঙ্ক নিয়ে | প্রথমা পড়াশোনা যে করে না, তা নয়, কিন্তু মন বসাতে পারে না বিষয়গুলোতে | তার প্রাণ ছোটে শুধু কবিগুরুর দিকে | শরৎ চন্দ্রের পথের দাবীতেও সে নেতাজিকে খুঁজে বেড়ায় বারবার | একবার স্কুলে ক্লাসের মধ্যে বাজি ধরা হয়েছিল, যে ছাত্র বা ছাত্রী খ্রীস্টমাসের ছুটিতে "আনন্দমঠ" শেষ করতে পারবে, তাকে একটা পুরো রবীন্দ্ররচনাবলী দেওয়া হবে পুরস্কার হিসেবে | তার আগে অবশ্য আনন্দমঠের যে কোনো অংশ থেকে প্রশ্ন করা হবে |
সবাইকে পিছনে ফেলে নিজের ঘরে প্রথমা নিয়ে এসেছিলো রবীন্দ্র রচনাবলী | স্কুলের বিভিন্ন লেখা, তাৎক্ষণিক বক্তৃতা প্রতিযোগিতায় সেই দুটো বছরে প্রথমাকে কেউ ছুঁতে পারেনি | কিন্তু সাহিত্যে প্রথম হওয়া প্রথমা উচ্চমাধ্যমিকে অঙ্ক আর রসায়ন বিজ্ঞানে করে বসলো ফেল | প্রথমার বাবা প্রথমার গল্প লেখার খাতাটা নিয়ে ছুঁড়ে ফেলে দিয়েছিলেন | প্রথমা নিঃশব্দে সেটাকে কুড়িয়ে আনতে গেলে প্রথমার বাবা সেই খাতা ছিঁড়ে আগুনে পুড়িয়ে দেন | মা চুলের মুঠি ধরে টান মেরে বলেছিলেন, " বেহায়া মেয়ে, বংশের মুখে চুন কালি মাখাতে লজ্জা হোলো না তোর | এই জন্যই কী তোর নাম প্রথমা রেখেছিলাম ?? "
তারপরে একটা বছর আর গল্পের খাতা ছুঁয়ে দেখেনি প্রথমা, মন দিয়ে অঙ্ক আর কেমিস্ট্রিটা পড়ে পরীক্ষা দিয়ে মাকে বলেছিল, " গ্রাজুয়েশনে যদি আমাকে পড়াতে হয়, তবে আমি বাংলা নিয়েই পড়বো | নাহলে এইচ. এস অব্দিই আমার পড়াশোনা থাকবে | "
প্রথমার মা বুঝেছিলেন, মেয়ের জেদের সামনে এবার স্বামী - স্ত্রীকে হার মানতেই হবে |
গ্রাজুয়েশনে বাংলা নিয়ে পড়াশোনা শুরু করলেও প্রথমার বাবা মা ভেবেছিলেন, তাদের মেয়ে অপমানিত হয়ে লেখাটাই বোধহয় বন্ধ করে দিয়েছে | কিন্তু লেখাটা চুপিচুপি চলছিলই প্রথমার | পুরোনো সব দিনগুলোর স্মৃতি কিভাবে ফিরে আসছে আজ চোখের সামনে |
হঠাৎ প্রথমার কানে এল, দিতি বলছে, "হ্যাঁ, জয়িতা মাসীমণি, মা একটু ঘুমোচ্ছে | আমি মাকে বলে দেবো, তুমি ফোন করেছিলে | মা তোমাকে পরে ফোন করে নেবে | "
প্রথমার মনে পড়লো চাকরির জীবনে প্রথম দিনটার কথা | বাবা চাকরি করতে করতেই আকস্মিক হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে মারা যান | প্রথমা তখন
গ্রাজুয়েশনের থার্ড ইয়ারের ছাত্রী | সরকারী নিয়মের সমস্ত বেড়া গন্ডী টপকিয়ে যখন বাবার চাকরিটা সে পায়, তখন সে এম.এ পাশ করে গেছে | তবুও স্কুলে চাকরি করতে ঢুকে এই জয়িতাদিই প্রথম বলেছিল, "তোমার কী ভাগ্য গো প্রথমা !! কোনো পরিশ্রম, কোনো লড়াই না করেই কী করে হাই স্কুলের টিচার হয়ে গেলে !! "
প্রথমা সেদিনই বুঝেছিলো, চাকরি ক্ষেত্রে তাকে অনেক অপমান সহ্য করতে হবে | যতই প্রতিভা থাকুক না কেন, সবার কাছে তাকে এটাই শুনতে হবে যে, সে তার নিজের যোগ্যতায় চাকরি পায়নি, পেয়েছে তার বাবার কৃপায় |
স্কুলের ছাত্রীদের কাছে অল্প কিছু মাসের মধ্যেই খ্যাতি পেয়ে যাওয়াতে স্কুলের সহকর্মীদের কাছে যেন চক্ষুশূল হয়ে উঠল প্রথমা | সামনে ভদ্র ব্যবহার দেখালেও পিছনে যে তাকে নিয়ে প্রচুর কথা হতো, এমনকি সেসব কথার মধ্যে যে তার লেখাকেও আক্রমণ করা হতো, এটা সে জানতো | তবুও চুপ করে থাকতো প্রথমা | একমাত্র বয়স্কা বড়দি খুব স্নেহ করতেন তাকে |
চাকরি পাবার তিন বছর পরে অলোকের সাথে বিয়ে ঠিক হয় প্রথমার | প্রথমার মা মেয়েকে বলেছিলেন, "তুই যে বাবার চাকরিটা পেয়েছিস, সেটা ছেলের বাড়িতে বলার দরকার নেই | সরকারী শিক্ষিকা তুই, এটুকুই যথেষ্ট ওদের জন্য | "
প্রথমা মাকে মানা করে বলেছিল, "না, মা তা হয় না | নতুন সম্পর্ক মিথ্যে দিয়ে তৈরী করে কী লাভ ?? যা সত্যি, সেটা জানিয়ে দিতে আপত্তি কী ?? "
প্রথমার সততার দাম কিন্তু অলোক দেয়নি কোনোদিনই | সে প্রাইভেট ফার্মে কাজ করা মানুষ | সকাল থেকে রাত অব্দি তাকে যথেষ্ট পরিশ্রম করে রোজগার করতে হয় | তাই প্রথমার ফোকটে পাওয়া চাকরিটা নিয়ে সে বেশ ঈর্ষাকাতর থাকে | তাই যেকোনো কথাতেই বলে ওঠে সে, "সুখের চাকরি করো, তাও কপাল গুণে পেয়েছো, কষ্ট করেও পেতে হয়নি | তুমি আর বুঝবে কী, প্রাইভেট জব করার কষ্ট ?? "
প্রথমা মনে মনে হাসতো অলোকের ছেলেমানুষি দেখে, কিন্তু কখনো কিছু বলতও না, মনেও কিছু করতো না | দিতি যখন খুব ছোট সেই সময়ই প্রথমার ডাক এল বি. এড করার জন্য | অলোক প্রথমাকে বলল, "যা ট্রেনিং করার এখনই করে নাও, দিতি বড়ো হবার আগেই | "
ট্রেনিং কলেজে ঢুকে প্রথমা কয়েক মাসের মধ্যেই কলেজের প্রফেসর আর প্রিন্সিপালের প্রিয় পাত্রী হয়ে গেলো, এটা সহ্য হোলো না বাকি ডেপুটেশনে আসা টিচারদের | বন্ধুত্ব হোলো বটে, তবে একটা সূক্ষ্ম বেড়া রয়েই গেলো সবার সাথে | তবে কলেজের বাকি ছাত্রীরা প্রথমাকে খুব ভালোবাসতো, কারণ প্রথমার লেখার হাত খুব ভালো ছিল বলে নিজের ভাষায় খুব সুন্দর করে লিখতে পারতো সমস্ত প্রশ্নের উত্তর | ওর সেই উত্তরগুলো অন্যদেরও সাহায্য করতো | এতে ডেপুটেশনে পড়তে আসা প্রথমার মতো অন্য টিচার ওরফে ছাত্রীরা গেলো রেগে | মাঝেমধ্যেই টিকা টিপ্পনি করতো ওদের মধ্যে বেশ কিছু জন | যে নামের প্রাপ্য সে ছিল, সেই নামের বঞ্চনা তাকে সহ্য করতে হয়েছে | এসব পুরোনো কথা আজও ভোলেনি প্রথমা |
তারপরে এল ফেসবুক | সারা পৃথিবী হামলে পড়লো সেই মুখপত্রের ভিতরে | ততদিনে দিতি অনেকটাই বড়ো হয়ে গেছে | বিয়ের পরে বিশেষ প্রয়োজন ছাড়া রোজকার লেখালেখির চর্চা বন্ধ হয়ে গিয়েছিলো প্রথমার | দিতিকে স্কুলের গল্প লেখার জন্য বিভিন্ন গল্পের প্লট বলে সাহায্য করে দিতো প্রথমা | তারপরে বলত, " নিজের মতো করে ভেবে লেখ | লেখাটা নিজস্ব, ওটা নিজেকে ভেবেই করতে হয় | "
যখন পরপর দুবছর স্কুলে লেখা সিলেক্ট হয়ে গেলো দিতির, তখন একদিন মাকে দিতি বলল, "আচ্ছা মা, তুমি এতো সুন্দর গল্পের প্লট দাও, তুমি কেন গল্প লেখো না ?? "
প্রথমা হেসেছিলো খুব | তারপরে বলেছিল, "বাথরুম সিঙ্গার হয় জানিস তো, আমিও সেইরকমই বাথরুম রাইটার | বাথরুমে বসে বসেই গল্পের প্লট ভাবি, তারপরে সেই ভাবনাগুলোকে জলের সঙ্গে বাথরুমের টার্মিনাল দিয়ে বার করে দিই | "
দিতি তখন একটু বড়ো | সে বুঝে গেছে, তার মায়ের কলমে জোর আছে | তাই মাঝে মধ্যেই চেপে ধরে মাকে, "মা, তুমি লেখো না কেন ?? "
প্রথমা মেয়েকে আদর করে বলে, "তুই লেখ, লেখালেখি করলে আরও বেশি করে সৃষ্টিশীল হতে পারবি | "
একবার স্কুল থেকে স্টোরি রাইটিং এর কম্পিটিশনে নাম দিলো দিতি | কম্পিটিশনটা ছিল ন্যাশনাল বেসিস | দিতি নাম দেওয়ার আগেই বলেছিল, "তুমি হেল্প করবে তো মা ?? "
প্রথমা বলেছিল, "ভাষা, সংলাপ, প্লট সব তোর হবে | আমি শুধু তোকে চরিত্র তৈরীতে সাহায্য করবো |"
আটশো শব্দের মধ্যে গল্প লেখা শেষ করতে হবে | যতবার কোয়ালিফাই করবে, ততবার নতুন নতুন গল্প | রাউন্ড ওয়ান, রাউন্ড টু, তারপরে স্টেট লেভেল টপকে ন্যাশনালে পৌঁছে গেলো দিতি | প্রতিবারই গল্প নিয়ে মায়ের সাথে চলতো আলোচনা | প্রথমার কথামতো, ফাঁকা সময় পেলেই গল্পের চরিত্র, প্লট, সংলাপ নিয়ে ভাবতে বসে যেত দিতি | তার ফলও পেলো হাতেনাতে | দিতির হাতে উঠে আসলো ইন্ডিয়া'জ বেস্ট স্কুল লেভেল রাইটার এর পুরস্কার | সাথে প্রথম তিন জনের প্রতিযোগিতায় লেখা সমস্ত গল্প গুলো নিয়ে বেরোলো গল্পের সংকলন | দিল্লীতে অনুষ্ঠিত হওয়া সেই প্রতিযোগিতায় অলোক, প্রথমা দুজনেই উপস্থিত ছিল | অলোক ছিল মেয়ের গর্বে গর্বিত, কিন্তু প্রথমা পেয়েছিলো তৃপ্তি | সে যা করতে পারেনি জীবনে, তার মেয়ে সেটা করতে পারছে | সত্যিই, দিতির লেখার হাত খুব ভালো | তিন ঘন্টার মধ্যে আটশো শব্দের চয়ন করে একটা সংবেদনশীল গল্প সৃষ্টি করা, সত্যিই মুখের কথা নয় |
অনুষ্ঠানে উপস্থিত এক খবরের কাগজের রিপোর্টার বিজয়ী অদ্বিতীয়াকে জিজ্ঞেস করেছিল, "গল্প লেখার অনুপ্রেরণা কার কাছ থেকে পেয়েছো তুমি ?? "
দিতি জবাব দিয়েছিলো, "আমার মায়ের কাছ থেকে | "
রিপোর্টার পরক্ষনেই প্রশ্ন করেছিলেন, "তোমার মা কী একজন লেখিকা ?? "
দিতি কোনো জবাব দিতে পারেনি | সে সত্যিই জানে না, তার মা একজন লেখিকা কী না, কিন্তু সে এটা জানে, তার মায়ের মধ্যে একজন সৃষ্টিশীল মানুষের বাস আছে, যিনি অনেক গল্প কবিতার জন্ম দিতে পারেন |
হোটেলে ফিরে অলোক সেদিন খুব গর্ব করে বলেছিল মেয়েকে, "তোর নামটা "অদ্বিতীয়া" রেখে তোর মা ভালোই করেছে, সার্থক করছিস তুই | আমি তো প্রথমে ভয়ই পেয়েছিলাম | তোর মায়ের নামের মতো যদি তোর নামটাও ফ্লপ যেত | "
দিতি দেখেছে, বাবার এই ধরণের ব্যঙ্গের কোনো উত্তর তার মা দিতো না | ভীষণ নির্লিপ্ত থাকতো এসব কথাতে | সেদিন রাত্রে বাবা ঘুমিয়ে পড়লে মায়ের সাথে হোটেলের বারান্দায় দাঁড়িয়ে মাকে প্রশ্ন করেছিল দিতি, "মা, তোমার খারাপ লাগে না, অপমানে লাগে না, বাবা তোমার সাথে বারবার এ ধরণের আচরণ করে বলে ?? "
দিতি বলেছিল, "খারাপ বা লজ্জা তখন লাগতো, যখন আমি জানতাম, যে আমার মধ্যে কোনো কোয়ালিটি নেই | কারোর কথায় কিছু যায় আসে না রে, যতক্ষণ না তুই নিজের কাছে নিজে ছোট হয়ে যাচ্ছিস | আমি কারোর কথাকে কোনো পাত্তাই দিই না | "
"কিন্তু মা, তোমার কী মনে হয় না, জগৎ সংসারে নিজেকে প্রমাণ করার প্রয়োজন আছে !! একটা প্লাটফর্ম সত্যিই দরকার হয় | তুমি অন্ততঃ এটা বোলো না যে, তুমি লেখালেখি করতে পারো না!! আমি কিন্তু মোটেও বিশ্বাস করবো না সেটা | "
প্রথমা এবার মুখ খুললো, "একটা সময় ছিল রে, যখন লেখাটা আমার নেশা ছিল | আমি কোনো লেখালেখির কম্পিটিশনে নাম দিয়ে সেকেন্ড হইনি | ভালো ছাত্রী কোনো কালেই ছিলাম না, তবে মাতৃভাষা আর সাহিত্যটাকে বরাবরই খুব ভালোবেসে এসেছি | তাই, বাংলাটা আমার কাছে সবসময়ই খুব প্রিয় | তাই হয়তো, স্কুলে সব ছাত্রীদের কাছে আমি এতো প্রিয় ছিলাম , সুন্দর ভাবে কঠিন ভাষাটাকে ওদের রপ্ত করাতাম বলে | "
দিতি এবার প্রশ্ন করে, "আচ্ছা মা, তোমার কী মনে হয়, দাদুর চাকরিটা না পেলে তুমি শিক্ষিকা হতে পারতে না ?? "
দিতি বলল, "হয়তো হাই স্কুলের দিদিমণি হতাম না | কিন্তু কলেজের প্রফেসর তো নিশ্চয়ই হতাম | সময়ের আবহে সংসার আর সুযোগ দেয়নি রে, জীবনে আরও এগিয়ে যাওয়ার | যাই হোক, আমি না পেরেছি তো কী হয়েছে, তুই তো পেরেছিস | ন্যাশনাল লেভেলে তোর বই বেরোবে, এটা কী কম কথা রে !! "
দিতি কিছুক্ষন চুপ করে থাকলো | প্রথমা বলল, "কী রে, কোথায় হারিয়ে গেলি ?? "
দিতি বলল, "আমার এই অ্যাচিভমেন্টের জন্য তুমি আমাকে কোনো উপহার দেবে না মা ?? "
প্রথমা বলল, "বল, কী চাস ?? "
"আমি চাই মা, এরপরে কেউ কোনোদিন যদি জিজ্ঞেস করে আমায়, যে, আমার লেখার অনুপ্রেরণা কে, তাহলে যেন আমি বলতে পারি, আমি আমার মাকে দেখে শিখেছি | আমিও আমার মায়ের মতো রাইটার হতে চাই | "
প্রথমা মেয়ের দিকে তাকালেন | মনে পড়লো সেই পুরোনো দিনটার কথা, যেদিন বাবা তার গল্পের খাতাটা ছিঁড়ে আগুনে পুড়িয়ে দিয়েছিলেন | দিতিকেও সে "বাবা" বলেই ডাকে | তবে কী এক বাবার ভুল আরেক বাবা শুধরে দিতে চাইছে !!
প্রথমা বলল, "আমার রাইটার হয়ে কী লাভ, বল?? লেখা গুলো তো সব খাতার পাতার মধ্যেই গুমরে মরবে | "
"তা কেন মা,, তোমারও বই বেরোবে!! এখন কত গল্প লেখার এপ আছে, সেখানে ভালো ভালো গল্প লিখলে এমনিই তোমার কত নাম হবে | লেখালেখি থেকে দূরে সরে গিয়ে তুমি শুধু নিজেকেই ঠকাচ্ছ না, তুমি সেই সমস্ত পাঠক পাঠিকাকে ঠকাচ্ছ যাঁরা তোমার গল্প পড়ে সমৃদ্ধ হতে পারেন | "
সেই রাতে মেয়ের হাতে হাত রেখে কথা দিয়েছিল প্রথমা, সে নিজেকে একজন লেখিকা করে তুলবে | এই বিশ্বসংসারে একটা ক্লাস এইটে পড়া মেয়ে তার মায়ের মনের আকুতি বুঝলো, মাকে টেনে আনলো সেই জগতে যে জগৎ থেকে প্রথমা নিজেকে সরিয়ে রেখেছিলো সংসারের আর পাঁচটা কাছের মানুষের পরিতৃপ্তির জন্য |
কলম ধরেই খ্যাতির সীমানায় পৌঁছতে খুব বেশি দেরী লাগলো না প্রথমার | একের পরে এক পুরস্কার আর সম্মাননা এসে তার আঁচল ভরিয়ে তুললো | সাথে থাকলো নিজস্ব ফেসবুক পেজেও প্রচার |
এরকমই একটা এপে গল্প লেখার মাধ্যমে পরপর তিন বছর সেরার সেরা লেখিকার উপাধি পেয়ে গেলো প্রথমা | প্রথমার গল্প মানেই অনুভূতির গল্প, সংবেদনার গল্প, বাস্তব জীবনের গল্প | সে গল্প যেন কথা বলে, যেন ছবি হয়ে ফুটে ওঠে শব্দগুলো, চরিত্রগুলো যেন পাঠকের চোখের সামনে ভেসে বেড়ায় !!
একবার অলোকের এক অফিসের গেট টুগেদারে গিয়েছিলো প্রথমা | অলোকের এক অ্যাসিস্ট্যান্ট ডিরেক্টরের স্ত্রী দৌড়ে এসে জিজ্ঞেস করেছিল, "কিছু মনে করবেন না প্লিজ,, আপনার নাম কী প্রথমা ?? "
অবাক হয়েছিল অলোক, প্রথমা দুজনেই | পাশ থেকে দিতি শুধু ফিসফিসিয়ে বলেছিল, "ইনি নিশ্চয়ই তোমার গল্প পড়েন | "
প্রথমা কিছু বলার আগেই অলোক বলে উঠল, "আমার স্ত্রীর নাম যে প্রথমা, আপনি কী করে জানলেন ম্যাম ??"
ভদ্রমহিলা বলেছিলেন, "উনি আপনার স্ত্রী কিনা তা আমি কী করে জানবো | তবে উনি যে একজন নামকরা লেখিকা সেটা জানি | জানেন ম্যাম, আমি আপনার গল্পের অপেক্ষায় বসে থাকি | আপনি বই বার করছেন না কেন বলুন তো ?? "
অলোক অবাক হোলো | সে যাকে ম্যাম বলে সম্মান প্রদর্শন করছে, সেই ভদ্রমহিলাই প্রথমাকে ম্যাম বলে সম্মান জানাচ্ছেন | তারপরে, ভদ্রমহিলা বললেন, "একটা অটোগ্রাফ যদি পেতাম আপনার !! "
তারপরে ব্যাগের মধ্যে বোধহয় কোনো কাগজ খোঁজার চেষ্টা করলেন, না পেয়ে বললেন, "কাগজ নেই তো !!... একটা কাজ করবো?? আপনার সাথে একটা ছবি তুলতে পারি কী ?? "
প্রথমা বুঝতে পারে না, কী জবাব দেবে | তার স্বামীর বসের বৌ তার লেখার ফ্যান !! এ যে স্বপ্নাতীত!!
দিতি আস্তে আস্তে বলল, "যাও মা, ছবি তোলো | আজ বাবার অবাক হওয়ার দিন | "
ভদ্রমহিলা বেশ কিছু ছবি তুললেন, তারপরে উনার বন্ধুদের হোয়াটস্যাপ গ্রুপে ভিডিও কল করে বন্ধুদের সাথে আলাপ করিয়ে দিলেন প্রথমার | তারপরে স্বামীর সাথে আলাপ করানোর সময় বললেন, "তুমি তো কখনো বলইনি যে, উনি অলোকবাবুর স্ত্রী | তাহলে একদিন বাড়িতে নিমন্ত্রণ করতে পারতাম !! "
অলোকের মনে পড়ছে, প্রথমার গল্প লেখা দেখে সে তার অভিন্ন হৃদয় বন্ধুর সাথে মিলে প্রথমাকে নিয়ে কী তামাশাই না করেছিল | তবুও প্রথমা লেখা থামায়নি | ওর একটাই কথা ছিল, "আমি দিতির জন্য লিখি, দিতির মনের খুশির জন্য লিখি | তোমরা আমাকে যে যাই বলো, আমি লেখা থামাবো না | "
আজ প্রথমার প্রতি শ্রদ্ধায় মাথা নত হয়ে আসছে অলোকের | যে অ্যাসিস্ট্যান্ট ডিরেক্টরের সাথে কথা বলতে গেলে দুবার ঢোক গিলতে হয় তাকে, সেই মানুষটার স্ত্রী প্রথমার সাথে একটা ছবি তুলে কত আনন্দ পাচ্ছেন !! আজ মনে হচ্ছে, বাবার চাকরি পাওয়াটা প্রথমার ভাগ্য হলেও সেটা তার অক্ষমতা নয় | তার স্ত্রী যে একজন প্রতিভাময়ী মানুষ, এবং সে যে তাকে শুধু মাত্র স্ত্রীয়ের আসনে বসিয়ে এতদিন মূর্খামি করে এসেছে, এটা ভাবতেই মাথা নত হয়ে গেলো অলোকের |
অ্যাসিস্ট্যান্ট ডিরেক্টর মিস্টার সান্যাল জিজ্ঞেস করলেন প্রথমাকে, "আপনার কোনো বই বার করেননি এখনও ?? "
প্রথমা চুপ করে করেছিল | দিতিই পাশ থেকে উত্তর দিলো,"এবার বইমেলায় বেরোবে মায়ের লেখা | মা একটি এপে প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণ করে পরপর তিন বছর সেরার সেরা লেখিকার খেতাব জিতেছেন | তাদের মাধ্যমে মায়ের ই-বুক বেরিয়েছে অনেকদিন আগেই | তবে এবার বইমেলায় প্রকাশ পাবে মায়ের নতুন উপন্যাস | "
মিসেস সান্যাল বললেন, "আমাকে জানাবেন প্লিজ, আমি যাবো আপনার বই প্রকাশের দিনে | অবশ্য, আমি তো আপনাকে ফলো করিই আপনার পেজে | আপনার পেজে নিশ্চয়ই দেবেন সবটা জানিয়ে, সেখান থেকেও জানতে পারবো | "
মিস্টার সান্যাল রাগ করে অলোককে বললেন, "এতদিন আমাদের কাছে তোমার মিসেসকে নিয়ে একটা কথাও বলোনি !! কী অদ্ভূত তুমি !! "
অলোক মনে মনে বলে, "আমিই কী জানতাম, আমার বৌ এতো নামী কেউ হয়ে গেছে | "
সেদিন অলোক গাড়িতে বসে প্রথমার হাত ধরে বলেছিল, "সরি, প্রথমা, তোমায় চিনতে ভুল করেছিলাম আমি | দিতি ভালো গল্প লেখে বলে ওকে নিয়েই গর্ব ছিল আমার, কিন্তু দিতি যে তোমার প্রতিভাটাই পেয়েছে, সেটা আজ বুঝতে পারলাম | "
দিতি পিছন সিট থেকে ঘাড় উঁচিয়ে বলেছিল, " আমি তো ইংলিশে গল্প লিখি বাবা | কিন্তু মায়ের মতো বাংলায় গল্প আমিও লিখতে পারবো না | বাংলাটা কিন্তু সত্যিই খুব শক্ত, আর সেই ভাষায় লিখতে গেলে দম লাগে | "
প্রথমা জবাব দিয়েছিলো, "গল্প লেখার জন্য অনুভূতির প্রয়োজন হয়, মাধ্যম সে যে কোনো ভাষাই হতে পারে | লেখার আগে ভাবতে হবে, যে লেখা তুই লিখছিস , সেটা পাঠকের মন ছোঁয়ার আগে তোর নিজের মন ছুঁয়ে যাচ্ছে কী না !! "
সেই দিতি এখন উচ্চমাধ্যমিক দেবে | সি. বি. এস. সি. বোর্ডের টুয়েলভে বোর্ড দেবে সে | ক্লাস টেনে দুর্দান্ত রেজাল্ট করার পরেও হিউমানিটিস নিয়ে পড়াশোনা করছে সে | উদ্দেশ্য একটাই, ভবিষ্যতে অক্সফোর্ড ইউনিভার্সিটিতে গিয়ে ইংলিশ সাহিত্য নিয়ে পড়াশোনা করবে | অলোক একটু আপত্তি করলেও প্রথমা বলেছিল, "সবাই রাইটার হয়ে জন্মায় না | আমাদের দিতি জন্মেছেই রাইটার হবে বলে | ওকে ওর মতো করে উড়তে দাও প্লিজ | "
অলোক আর আপত্তি করেনি | সেই দিতি মায়ের আজকের খ্যাতির দিনে কেমন করে যেন সবটুকু সামলে যাচ্ছে | তার প্রথম উপন্যাস "আত্মজা" যে তারই দিতিকে উৎসর্গ করা, সেটা বলা হয়ে ওঠেনি দিতিকে | বেস্ট সেলারের তকমা পেয়েছে বইটা | হুহু করে বিক্রি হয়ে যাচ্ছে | এই বই যে মনোগ্রাহী হবেই, কারণ সব ঘরেই তো একটা করে প্রথমা লুকিয়ে আছে যাঁরা জীবনে একটা দিতির স্পর্শ পেতে চায়!!
পুরোনো সেই দিনগুলো থেকে নিজেকে বের করে এনে বিছানা থেকে নেমে পড়লো প্রথমা | কী হবে পুরাতনের দুঃখ ঘেঁটে, যখন সামনে চলার পথ এতো সুন্দর !!
আজ দিতিকে বুকে জড়িয়ে খুব করে আদর করতে হবে | এমন পরী কজন মানুষ পায় !!
দরজা খুলেই প্রথমা দেখলো, তার পরী জাদুকাঠির ছোঁয়া দিয়ে মায়ের সব পরিচিতদের সামলাচ্ছে | ফোন ধরে বলছে, "হ্যালো ..... "
প্রথমা ঘরে ঢুকে দিতির মোবাইল নিয়ে কল করলো তার পরীকে, "হ্যালো, ম্যাডাম, আমার সবচেয়ে কাছের মানুষ, আমার সবচেয়ে প্রিয় মানুষটাকে একটু কাছে পেতে চাই | পেতে পারি কী ?? অনেক গল্প করার আছে | "
দিতি উঠে এল মায়ের কাছে, মায়ের সাথে গল্প করবে বলে | এমন সময় আবারও রিং,, মা মেয়ে দুজনেরই ফোনে | প্রথমা ফোনটা নিয়ে সুইট অফ করে দিলো | দিতিও ঠিক তাই করলো | অনেক হয়েছে লোক দেখানো বন্ধুত্বের শুভেচ্ছা গ্রহণ | এখন শুধু পরম দুই বন্ধুর একে অপরের কাছে সমর্পনের পালা | আজ প্রথমা, মেয়ের হাতে হাত রেখে বলল, "কথা রেখেছি তো দিতি ?? মনে পরে তোর সেই দিল্লীর হোটেলে কাটানো সেই রাতের কথা ?? "
দিতি মায়ের বুকে মাথা রেখে বলে, "পুরানো সেই দিনের কথা সে কী ভোলা যায় ... "
মা, মেয়ে দুজনের প্রাণ খোলা হাসিতে ভরে ওঠে ঘরটা, আর "আত্মজা" টেবিলের উপরে থেকে সেই হাসি উপভোগ করতে থাকে |
--------------------------------------------------------------
সমাপ্ত
#গল্প
#পুরানো_সেই_দিনের_কথা
#কলমে_অনন্যা_পোদ্দার
Comments
Post a Comment