মূল্য
আহান বাড়িতে ফিরতেই ঈশা বলে উঠল,
"আমি একটা স্বর্ণের চেইন কিনব। আমাকে কিনে দেবে, প্লিজ?"
"কত লাগবে?"
"আট হাজার দিলেই হবে। বাবার বাড়িতে থাকতে তো আমি ২২ ক্যারেট ছাড়া কখনো পরিনি। তবে তোমার অবস্থা তেমন না, তাই ১৮ ক্যারেটের ২ আনার কিনব।"
আহানের মুখ কিছুটা চুপসে গেল। ঈশা প্রায়ই তার বাবার সাথে তার তুলনা করে। তার অল্প বেতনে তার বাবার মত প্রাচুর্য দিয়ে সে ঈশাকে রাখতে পারবে না, সম্ভবও না। আজকেই তার বেতন দিয়েছে। ক্লান্তমুখে ঈশার দিকে তাকিয়ে বলল,
"আচ্ছা, দেখছি।"
.......
বেতনের খামটা মায়ের হাতে তুলে দিলো আহান। সংসারের সমস্ত খরচ মা ই দেখে। ঈশার কাধে এখনো এই দায়িত্বটা এসে পড়েনি। আহানকে ইতস্তত বোধ করতে দেখে মা জিজ্ঞেস করলেন,
"কিছু বলবি?"
"ইয়ে মানে...ঈশা একটা স্বর্ণের চেইন কিনতে চাচ্ছে। ওকে সরাসরি কীভাবে মানা করতে পারি, বলো?"
মা বেতনের খামটা আবার আহানের দিকে বাড়িয়ে দিয়ে বললেন,
"এটা নে। বউমার হাতে এবার তোর রাজ্যপাট তুলে দে।"
আহান মন খারাপ করে জিজ্ঞেস করল,
"তুমি রাগ করেছো আমার উপর? স্যরি মা।"
"আরে বোকা রাগ করব কেন? বউমা এখনো জানে না এই দুর্মূল্যের বাজারে আমাদের মত মধ্যবিত্তদের কাছে ২২ হাজার টাকা আসলে কত টাকা। তার বাবা তাকে কখনো অভাব বুঝতে দেয়নি। কোনটা কত টাকা দিয়ে কিনে আনা হয়েছে সেসবও সে জানে না। এবার নাহয় শিখুক।"
"কিন্তু মা, ও এই সংসারে এসেছে মাত্র দুই মাস হলো। এখনই ও এই দায়িত্ব নিতে পারবে?"
"পানিতে না নামা পর্যন্ত কেউ কি সাঁতার শেখে?"
.........
খামটা ঈশার দিকে বাড়িয়ে দিতেই সে খুশি হয়ে বলল,
"আমি জানতাম তুমি আমার এই শখ পূরণ করবে। কত আছে এতে?"
"বাইশ হাজার।"
ঈশা অবাক হয়ে বলল,
"এত লাগবে না তো। আমি জানি তোমার আর্থিক অবস্থা এত ভালো না। তাই সুতোর মত পাতলা চেইনই নিবো।"
আহান একটু হেসে বলল,
"এখানে শুধু তোমার চেইনের টাকা না, মাসের বাজার খরচ, মায়ের ঔষধ খরচ, কারেন্ট বিল, গ্যাস বিল, বাড়ি ভাড়া, ডিশ বিল যা যা লাগে সব খরচও আছে।"
ঈশা হা হয়ে গেল শুনে।
"মাত্র বাইশ হাজারে এতকিছু কীভাবে সম্ভব!"
"চাইলেই সম্ভব। আমার মা তো চালিয়েছে। নতুন নতুন সংসারের দায়িত্ব পেলে। আমি আর মায়ের থেকে হেল্প নিতে পারো।"
এই বলে সে বাথরুমে ফ্রেশ হতে চলে গেল। ঈশা দাঁড়িয়ে ভাবছে এমন ছাপোষা একটা ঘরে তার বাবা কেন তাকে বিয়ে দিলো! এতদিন সে ভদ্রতাবশত স্বামীর বেতন জানতে চায়নি। কিন্তু তার বেতন মাত্র বাইশ হাজার শুনে অবাক হয়ে গেল।
.........
সকাল থেকে ভেবে রেখেছে আজকেই সে মার্কেটে যাবে চেইনটা কিনতে। আগে থেকে ফ্রিজে সবজি, মাছ, মাংশ রয়েছে। সেসব দিয়ে আরো ৬-৭ দিন চলে যাবে। নাস্তা সেরে আহানের সাথেই বের হওয়ার পরিকল্পনা করেছিল সে। সে অফিসে যাবে আর ঈশা মার্কেটে যাবে।
কিন্তু তখনই দরজায় কলিংবেলের শব্দ। দরজা খুলে দেখল বাড়িওয়ালা দাঁড়িয়ে। সে হাসিমুখে বলল,
"চাচা, ঘরে আসুন।"
"না মা। বাড়িভাড়াটা যদি দিয়া দিতা তাহলে ভালো হয়।"
"ওহ, ভাড়া কত, চাচা?"
"ছয় হাজার।"
ঈশা খাম থেকে ছয় হাজার টাকা বের করে বাড়িওয়ালার কাছে তুলে দিলো। আর বাকি রইলো ১৬ হাজার, মনে মনে হিসাব কষলো ঈশা।
.........
আহান নাস্তা সেরে বের হতে যাওয়ার আগে ঈশাকে বলল,
"আমার বাস ভাড়াটা দেবে? আমার এমনিতে বাড়তি খরচ নেই। তবে বাসভাড়াটা না দিলেও সমস্যা নেই। হেঁটে চলে যাব।"
ঈশা বলল,
"আরে নাহ। এতদূর কী হেঁটে যাবে নাকি! দাঁড়াও, আমি এক মাসেরটা একবারে দিয়ে দিচ্ছি। কত লাগবে?"
"১৩০০ দিয়ে দাও।"
সে ১৩০০ টাকা আহানকে দিয়ে দিলো। ঈশার আর আহানের সাথে বের হওয়া হলো না। সে আবার নাস্তা করতে বসে পড়ল।
শ্বাশুড়ি মাও তখন নাস্তার টেবিলেই বসে ছিলেন। তিনি বললেন,
"বউমা, গ্যাস বিল, ডিশ বিল, কারেন্ট বিল এসব রেডি রেখো। পরে যেন কোনো ঝামেলা যেন হয়।"
ঈশা মাথা নেড়ে বলল,
"আচ্ছা, মা।"
.........
খাতা কলম নিয়ে সে বিলগুলো হিসেব করতে বসল। তার ভীষণ অসহায় লাগছে। তার মনে হচ্ছে সে কোনো সমুদ্রে এসে পড়েছে, অভাবের সমুদ্রে। তার বাবার বাড়ি থাকাকালীন এমনটা কখনো হয়নি।
ডিশ বিল ৩০০, কারেন্ট বিল এসেছে ৯০০, গ্যাসবিল ৬০০।
বিলগুলো আলাদা করে সরিয়ে রাখল ঈশা। সবশেষে দেখলো তার কাছে অবশিষ্ট আছে আরো বারো হাজার নয়শ।
মনে মনে খুশিই হলো সে। এই টাকা দিয়ে মোটামুটি একটা ভারী চেইনই কিনতে পারবে।
...........
ঈশা আর আহান বসে গল্প করছিলো। তখন মনোয়ারা বেগম এসে বললেন,
"আহান, আমার ঔষধটা এনে দিবি? ঔষধ শেষ।"
"তোমার ঔষধ আনা হয়নি এখনো?"
"নাহ।"
আহান, ঈশার দিকে তাকিয়ে বলল,
"নয়শ টাকা দিও তো।"
ঈশা মুখটা একটু বেজার করে নয়শ এনে দিলো। সে মনে মনে আবার হিসাব কষলো তার কাছে বাকি আছে আর বারো হাজার।"
..........
কয়েকদিন হয়ে গেল আলসেমি করে আর মার্কেটে যাওয়া হয়নি ঈশার। আজকে সে বের হতে যাবে তখনই শ্বাশুড়ি মা এসে বললেন,
"তুমি কি বের হচ্ছো?"
"হ্যাঁ, মা।"
"বাজার তো শেষ হতে চলল। এইযে ফর্দটা রাখো। এগুলো দেখে দেখে বাড়ি ফেরার পথে নিয়ে আসবে। ১৫ দিনের জন্য বাজার।"
"আচ্ছা দিন।"
বাজার সেরে হাঁপিয়ে গেছে সে। ঘেমে নেয়ে একাকার। ফর্দে ভাগ্যিস মা দাম পাশে লিখে রেখেছিলেন! নয়ত বেশি দাম দিয়ে জিনিস কিনে বাসায় ফিরতে হতো।
সবকিছু কিনে আনতে ৩০০০ লেগে গেল। আর বাকি ১৫ দিনের জন্য এরকম ৩০০০ ই নিশ্চয়ই লাগবে। অর্থাৎ ৬০০০ আলাদা খরচ হবে বাজারের জন্য।
...........
সেদিন মার্কেটে আর গেল না সে। বাসায় ফিরে ক্লান্ত হয়ে ড্রেসিন টেবিলের সামনে বসলো। এই প্রথম বারের মত সে বাজার করেছে। আগে তার স্বামীই বাজার করে আনতো। যত টাকা দরকার মায়ের থেকেই চেয়ে নিতো।
তখন খেয়াল হলো তেলের বোতল, স্নো, পাউডার খালি হয়ে আসছে প্রায়। তেল, সাবান এসবও তাকে কিনতে হবে।
..........
এভাবে পুরো এক মাস কেটে গেল। আহান বলল,
"তোমার চেইন কেনা হয়নি? দেখালে নাতো।"
সে বেতনের খামটা এনে তার সামনে দিলো। এরপর বলল,
"কীভাবে কিনবো? সব খরচ করে আর মাত্র এক হাজার বাকি আছে।"
"আচ্ছা, ঠিক আছে। এবার বেতন পেলেই তোমাকে নিয়ে একটা স্বর্ণের চেইন কিনে দেবো। খুশি তো?"
মন বেজার করে ঈশা বলল,
"নাহ। তাহলে অন্যান্য খরচে ঘাটতি পড়বে।"
আহান এবার ঈশার সামনে গিয়ে বসল। ওর হাত ধরে বলল,
"এক রাজার থেকে তার রাজকন্যাকে নিয়ে এসেছি আমার কুটিরে। আমি জানি তোমার হয়ত এখানে থাকতে কষ্ট হচ্ছে। কিন্তু তোমার স্বামীর আয় তো খুব বেশি না। যতটুকু চাঁদর ততটুকুই পা মেলতে হবে।"
আহানের এই কথাতে ঈশার মন যেন গলে গেল। সে অপলক তাকিয়ে আছে আহানের দিকে। আহান আবার বলল,
"দূর্মূল্যের এই বাজারে এই অল্প বেতনে হয়ত তোমার সব শখ আহ্লাদ পূরণ হবে না, কিন্তু কথা দিচ্ছি, আল্লাহ চাইলে তোমার প্রয়োজনীয় জিনিসে কখনো ঘাটতিও হবে না।"
"আমার কিচ্ছু লাগবে না, আহান। শুধু তোমরা আমার পাশে থেকো।"
"আমরা সবসময় তোমার পাশে আছি। এই এক হাজার টাকা তুমি জমিয়ে রাখো। কয়েক মাস এভাবে জমাতে জমাতে তোমার গয়নার টাকা হয়ে যাবে। চাইলে তুমি নিজেও হালাল পথে ইনকাম করতে পারো।।"
...........
এভাবে কেটে গেল প্রায় এক বছর। ঈশার শ্বাশুড়ি মা বসে ছিলেন। মনোয়ারা বেগমের সামনে একটা গয়নার বাক্স এগিয়ে দিয়ে ঈশা বলল,
"মা, দেখুন তো কেমন হয়েছে? আমার জমানো টাকায় কেন।"
মনোয়ারা বেগম খুশি মনে গয়নার বাক্সটা খুললেন। গয়নার দিকে তাকিয়ে থেকে বললেন,
"তোমার মুখ দেখে আমি তোমাকে যেই গয়নাটা দিয়েছিলাম, সেটাও আমার সংসার খরচ বাঁচিয়ে জমানো টাকায় কেনা। জানো, এভাবে জিনিস গড়তে আলাদা এক তৃপ্তি পাওয়া যায়।"
এরপর বাক্সটা বন্ধ করে ঈশার দিকে বাড়িয়ে দিয়ে বললেন,
"খুব সুন্দর হয়েছে। নাও, সাবধানে রেখো।"
হুট করেই ঈশা তার শ্বাশুড়ি মাকে জড়িয়ে ধরে বলল,
"এটা আপনার জন্য, মা। আপনি আপনার জমানো টাকায় আমাকে উপহার দিয়েছেন, আমিও আমার জমানো টাকায় আপনাকে উপহার দিলাম।"
মনোয়ারা বেগমের আনন্দে চোখে পানি চলে আসলো। তার মনে হলো রাজপ্রাসাদের রাজকন্যা তার কুটিরে মানিয়ে নিতে শিখে গেছে।
(সমাপ্তি)
মূল্য
অরণী মেঘ
Comments
Post a Comment