ভালোবাসার শেষ রুপান্তর

বড় আপুর বিয়েতে যৌতুক হিসাবে দশ হাজার টাকা চাওয়া হয়৷ বিয়ের দিন বরযাত্রী খাওয়াতে হবে পঞ্চাশজন। আপুকে স্বর্ণের কানের দুল দিতে হবে। সাথে ছেলেকে একটা সাইকেল। সব মিলিয়ে চল্লিশ হাজার টাকার মতো খরচ। ঘটক সাহেব বাবার কাছে বার বার বুঝাতে চাইলেন, এমন ছেলে আর কখনো পাবে না মেয়ের জন্য। মা তখন এইসব শুনে বাবাকেও বুঝালেন ছেলে হাত ছাড়া করা যাবে না। চারদিকে ভেবে, বাবাও নিজের জমি বিক্রি করে দেন। গোয়াল ঘরের গরু করলেন বিক্রি। সব মিলিয়ে বিয়ে আয়োজন করা হলো। 

আমি তখন ৭-৮ বছরের। আপুর বয়স ১৬-১৭ হবে হয়তো। বিয়ের দিন তুবড়ি ফটকা বাজালাম,অনেক আনন্দ করলাম। বিয়ের আয়োজন সেইদিন শেষ হয়েছে। বিয়ের পর আবার আসা যাওয়া। সব মিলে আমাদের অনেক ঋণ হয়েছিলো ।

আমরা সবকিছু মিলিয়ে হিমশিম খেতে হয়েছিলো। আপুর বিয়ের পর বাবা অনেক কষ্ট করে ঋণশোধ করেন৷ বিয়ের কয়েকমাস পর থেকে আপুর সংসারে শুরু হয় অভাব। 

বোন জামাই যৌতুকের টাকা দিয়ে গ্রামে শুরু করেন চায়ের দোকানের ব্যবসা৷ বোন জামাইয়ের বন্ধু প্রতিবেশীর কবলে পড়ে দোকানের সকল কিছু হারালেন বাকিতে। যা পরে কখনো পায়নি। ব্যবসায় লস হওয়ার পর বোনকে পুনরায় পাঠান আমাদের থেকে টাকা নিতে। বাবা বোনের দিকে তাকিয়ে বাড়িখানা জামানত রেখে টাকা এনে দেন আবার। বোনকে যৌতুক দিতে গিয়ে আমরা একবারে  অর্থহীন হয়ে পড়লাম। 

বোন জামাই নিজের ভালোটা বুঝতে পারলো, তখন অনেক দেরি হয়ে গেছে। আমাদের থেকে যৌতুকের টাকা নিয়ে উড়িয়ে আমাদেরও শেষ করে দিলেন। নিজেই চাষাবাদ করে ভালো থাকার পথ খুঁজতে লাগলেন৷ আমরা আর ঋণের ভেতর থেকে বের হতে পারিনি৷ বাড়িটাও চলে গেলো আমাদের। বোন জামাইয়ের সংসার বড় হচ্ছে। আমার দুটা ভাগনি-ভাগিনা। সব মিলে ভালোই চলতে থাকে। 

আমরা গ্রাম থেকে ততদিনে শহরে চলে আসি। বস্তিতে ঘর ভাড়া করে থাকতে শুরু করলাম। বাবা রিকশা চালানো শুরু করেন। আমি পড়াশোনা বন্ধ করিনি। আমাদের সুখের সংসার তখন শেষ হয়ে যায় যৌতুকের জন্য। গ্রাম থেকে আপু, আসতেন শহরে। 

মাঝে ১২-১৩ টা বছর কেটে গেলো। আমারও কলেজ শেষ। একদিন গ্রাম থেকে খবর নিয়ে আসে করিম চাচা। যিনি আমার বাবার বন্ধু। আমাদের বাসায় আসলেন। 

মা তখন জিজ্ঞেস করেন, "আপনাকে এত চিন্তিত লাগছে কেন ভাই? "

করিম চাচা আমার সামনেই বলেন, "আপনার মেয়ে রিপা গতকাল আত্মহত্যা করেছে। আজকে সকালে লাশ মিললো। পুলিশ থানায় নিয়ে গেছে। আজকে সন্ধ্যায় হয়তো লাশ দিবে। আপনাদের নিতে আসছি। "

মা চিৎকার দিয়ে জ্ঞান হারান। একমাত্র মেয়ে আপু। আমরা দু'ভাই-বোন। 

আমি করিম চাচাকে বললাম, "কি করে এমন হলো চাচা? "

"তোমার বোন জামাই নাকি জুয়া খেলতে গিয়ে এমন করেছে। সকল অর্থ উড়িয়ে বসে আছে। শেষ দুদিন বাসায় খাবারের মতো কিছু নেই। রিপাকে তোমাদের থেকে টাকা নিতে বললো। তা নিয়ে ঝগড়ার পর রিপাকে আঘাত করলে কষ্টে আত্মহত্যা করে। "

মায়ের জ্ঞান ফিরলে বাবাকে কল দিয়ে বাসায় আনলাম। গ্রামে তখন মোবাইল সেবা পৌঁছায়নি৷ 
সবাই সেদিন গ্রামে চলে গেলাম৷ বোনকে মাটি দিয়ে শহরে ফিরে আসি। বোন জামাইকে আর থানা পুলিশ করিনি৷ ভাগিনা-ভাগনির কথা চিন্তা করে৷ 
শহরে আমাদের জীবন ভালোই চলতে থাকে। মাঝে কয়েক বছর কেটে গেলো। অনার্স শেষ করে একটা কোম্পানিতে চাকুরী নিলাম। চাকুরী পাওয়ার পর, গ্রামে বাড়ি করার চেষ্টা করি। বছর দুয়েক পরই গ্রামে নিজেদের বাড়িঘর করলাম। মা-বাবা তখন গ্রামে থাকেন। 

ইদে বাড়ি আসলাম বেড়াতে। নিজ গ্রামের বাতাসে নিঃশ্বাস নেওয়াও অনেক সুখের। করিম চাচা আমাদের বাড়ি আসলেন। মায়ের সাথে কথা বলছেন। আমি পাশের রুমে। তাদের কথা শুনছি। 

"ভাবি  রানার জন্য একটা মেয়ে দেখে আসলাম। আপনারও ঘরে ছেলের বউ আসলে, কষ্ট অনেকটাই কম হবে। "

'ভাই রানার মতামত ছাড়া দেখতে যাওয়া যাবো! দেখি রানাকে বলে তাহলে কালকে বিকালে মেয়ে দেখতে যাবো। '

করিম চাচার কথায় আমারও খেয়াল আসলো। সত্যি বিয়ে করে মা-বাবার কাছে রেখে গেলে সংসারে মায়ের একটু কষ্ট কম হবে। আবার তাদের দেখাশোনা করারও আমার স্ত্রী থাকবে। পরেরদিন সকালে মেয়ে দেখতে যাওয়ার কথা জানালেন। আমিও রাজি হলাম মেয়ে দেখতে যাবো। 

বিকালে আমি,মা-বাবা, করিম চাচা, চাচি সবাই গেলাম মেয়ে দেখতে। যাওয়ার সময় বাজার থেকে দুই কেজি মিষ্টি নিয়ে গেলাম। মেয়েদের বাড়িতে আসলে সবাইকে বসতে দিলেন। বাড়ির পরিবেশও বেশ ভালো৷ 
আমরা সোফায় বসে সবাই নাস্তা করছি। কিছুক্ষণ পর মেয়েকে আমাদের সামনে আনা হলো৷ মেয়ে দেখতেও ভালো। আমার দিকে মেয়েটা তাকিয়ে আছে। যেনো রাগান্বিত সে আমার উপর। অবশ্য দুদিন আগে গ্রামে আসার সময় তাঁর সাথেই পাশাপাশি বসে এসেছিলাম। 

সে খাগড়াছড়ি বোনের বাড়িতে গিয়েছিল। তাইন্দং আসার পথটা এক সাথে ছিলো। আমি ঢাকা থেকে খাগড়াছড়ি আসলাম। সেখান থেকে বাড়ি।

মেয়েটা  চুপচাপ ছিলো, টুকটাক কথা বললো কেবল। বেশি কথা বলা হয়তো পছন্দ করে না।আমিই জিজ্ঞেস করি সব, কলেজে পড়ে আরো নানান কথা। নাম সোহাগী। 

মেয়ে দেখা আমাদের শেষ। মেয়েকে আমি আগেই দেখেছি। পছন্দও হয়েছে। 
করিম চাচা মেয়ের বাবাকে বলে, " আপনারা এসে দেখে যান। তারপর না হয় বিয়ের কথা সামনে এগিয়ে নিব। ছেলের বাড়িঘর সব দেখেন। "

সোহাগীর বাবা বলে,''আমরা আগেই জেনে নিয়েছি, আপনি যখন ছেলের কথা বললেন। আমরা আর কিছু খোঁজ নেওয়ার দরকার নেই৷ বিয়ের কথা বা কি করবেন আপনাদের স্বীদ্ধান্ত। "

মা বলেন, 'মেয়ে আমাদের পছন্দ হয়েছে। আমার ছেলেরও পছন্দ হয়েছে। ইদের আরো ৫দিন বাকি। তাই ইদের আগেই বিয়ের ব্যবস্থা করলে ভালো হয়। '

সোহাগীর বাবা তখন বলে,"আপনারা কি চান। কি দিবেন। যদি বলতেন,কথায় মিললে ইদের আগেই সব হবে। "

বাবা বলেন, "বেশি কিছুর দরকার নেই। টাকা পঞ্চাশ হাজার আর ছেলেকে একটা মটরসাইকেল। মেয়েকে আপনারা যা খুশী দেন। আর বিয়ের সময় সব মিলিয়ে ত্রিশ-চল্লিশজন লোক আসবে।"

সোহাগীর বাবার চেহারা একটু কালো হয়ে গেলো। কপালে চিন্তার ছাপ আমি ঠিকই দেখলাম। আজ থেকে আঠারো-বিশ বছর আগেও আপুর বিয়ের সময় এমন চেহারা বাবার হয়েছিল। আমি মা-বাবাকে নিয়ে ঘর থেকে বের হয়ে উঠানের কোনায় আসলাম। আমাদের উঠে আসা দেখে, সোহাগীর বাবা মুখটা আরো কালো হয়ে গিয়েছে। 

"বাবা-মা কি বলছো তোমরা?  যৌতুক নেব কেন?"

মা বলে,"যৌতুক কোথায় আর! একটা মেয়ের বাবা এইসব দিবে এটাই স্বাভাবিক। মেয়ে বিয়ে দিতে চাইলে দিতে হয় এমন "

বাবাও মায়ের কথায় সায় দিলেন৷ 

"আমাদের কথা ভুলে গেলে তোমরা। আপুর বিয়েতে এমন ছেলে হাত ছাড়া করা যাবে না। টাকা যা লাগে দিতে হয়েছে। শেষ পরিনতি আমরা রাস্তায় নেমে আসছি। আজ আমরাই সেটা করছি আবার। "

বাবা বলেন, "ছেলে এমনে বড় হয়নি। কিছু না নিলে কেমন দেখায়! "

"আপুর সময় তখন বললে, টাকা নিবে কেন আমরা মেয়েকে কষ্ট ছাড়া বড় করেছিলাম নাকি। আজ আমরা পরিবর্তন না হলে, সমাজ কি করে পাল্টাবে? "

মা-বাবা চুপ করে আছেন৷ 
আমি আবার বললাম, "পরিবর্তন আমাদের নিজ থেকে শুরু হোক। নিজের ঘর থেকে সবাই শুরু করলে সমাজ পরিবর্তন হয়ে যাবে। যৌতুক কতটা প্রভাব ফেলে, আমাদের চেয়ে ভালো কেউ জানে না। আজ আমরা কি করে আবার অন্যজনকে সেই একই কষ্টে ফেলি"

বাবা বলেন, 'এক মূহুর্তের জন্য ভুলে গেছি সেই দিনের কথা। আমাদের ভুল হয়েছে। আমরা কিছুই নিব না । আট-দশজন মানুষ এসে বিয়ে করিয়ে বাড়ি নেবো। মেয়ের বাবা তা না পারলে প্রয়োজনে এই খরচও আমরা করবো। '

বাবার কথা শুনে মনটা ভরে গেলো৷ ঘরের ভেতর এসে দেখি সোহাগীর বাবা এখনো মুখটা কালো করে আছেন। 
আমাদের দেখে বলেন, " আমরা সব দিবো। আপনারা কিছু দিন সময় দিতে হবে৷ ইদের পর বিয়ে হলে ভালো হবে। সব জোগাড় করতে সময় লাগবে৷ "

বাবা বলেন, "কিছুই লাগবে না আমাদের। "

সোহাগীর বাবা অসহায় চোখে তাকিয়ে বলেন, "বিয়েতে আপনারা যা চান দেবো। এইসব নিয়ে টেনশন করতে হবে  না । "

বাবা বলেন, "পুরো কথা শুনেন। আমরা কোন কিছুই আপনাদের থেকে চাইনা৷ আমরা যা পারি মেয়েকে দিয়ে নিবো৷ আপনার মেয়েটা আমাদের দিচ্ছেন এটাই সবচেয়ে বড় পাওয়া৷ কালকেই বিয়ের ব্যবস্থা করেন। বেশি মানুষ ও খরচ করে অর্থ নষ্ট করার মানে হয় না। আমরা দশ-বারোজন আসবো। কালকে মাগরিবের পর বিয়ের ব্যবস্থা করেন। "

আমাদের কথা শুনে সোহাগীর বাবার  হাসিমুখ দেখালেন। এটায় এতক্ষণ চিন্তায় ছাপ ছিলো। পরেরদিন আমাদের বিয়ে হয়ে গেলো৷ দু-পরিবার অনেক খুশী৷ যৌতুক ছাড়া বিয়ে গ্রামে আমাদেরই প্রথম৷ সবাই আমাদের কথা শুনে দোয়া করলেন কেবল। এমন চিন্তা সবাই করলে সমাজ আরো আগেই বদলে যেতো সবাই বললো।  আমাদের সুন্দর একটা জীবন শুরু হলো। কাউকে কষ্ট বা টেনশন দিয়ে নতুন জীবন শুরুতে শান্তি নেই। পরিবর্তন আমাদের থেকে শুরু হোক। সমাজ নিজেই বদলে যাবে। 

--সমাপ্ত --

গল্প- রূপান্তর 
লেখা-সোলাইমান রানা (দাদা)

Comments

Popular posts from this blog

সখি, ভালবাসা কারে কয়?

বিয়ের দুই মাস পরের রাত

সুন্দর করে বাঁচতে চাই আমি