আমি এতেই সন্তুষ্ট হয়ে গেছি
"আমার মেয়েকে বিয়ে করতে হলে কাবিন তিন লাখ দিতে হবে। আর স্বর্ণের গহনা সব মানে কানের দুল , গলায় নেকলেস , হাতের চুড়ি সব দিতে হবে। অন্যথায় আমার মেয়ে তোমাকে দিবো না। "
ইফতির মা আমাকে মোবাইলে কল দিয়ে বললো।
আমি জবাবে বললাম, "আন্টি এত টাকা আমি কোথায় পাবো? আমি চাকুরী করি কোন রকম পঁচিশ-ত্রিশ হাজার টাকার। আর আমি আমার সাধ্য অনুযায়ীই কাবিন দিবো তাই না? আমার কোন রকম যৌতুক বা বিয়ে উপলক্ষে একটা কানাকড়িও নিবো না। হারাম টাকা আমার খাওয়ার ইচ্ছে নেই। আর আমার পরিবারে কয়েকজন মানুষ কেবল বিয়েতে যাবে।আমি চাই, আপনাদের কোন অর্থ খরচ না হোক।যে বিয়েতে খরচ কম আল্লাহর রহমত বেশি থাকে। "
আমার কথা শুনে ইফতির মা আরো রেগে গেলো। আমাকে রেগে বলেন, "তুমি এইসব দিতে পারবে? নাকি না?"
"আমি চাই আমাদের কারণে কোন খরচ না হোক আপনার। অল্প কাবিনে সমস্যা কি? আমিতো আপনার মেয়েকে ছেড়ে চলে যাবো না। আমার দ্বারা ১লাখ কাবিন আর গহনা আমার সাধ্য মতো আমি দিবো। আপনারা একটা সুতাও দিতে হবে না। এর চেয়ে বেশি আর কী করবো?"
"আমার মেয়েকে অনেক ভালো ছেলে দেখে বিয়ে দিতে পারবো। তোমার কাছে আমি মেয়ে দিবো না৷ আর কখনো কথা বলবে না। "
আমার কথা শুনার আগেই কল'টা কেটে দিলো।
চুপ করে বসে রইলাম। ইফতির আর আমার দু-পরিবার বিয়ের কথা ঠিক করে। আমার আর ইফতির ভালোবাসার সম্পর্ক বছরখানেক আগে থেকে। আমি তখন অনার্স শেষ। চাকুরীর চেষ্টা করি । একটা কোচিং সেন্টারে শিক্ষকতা করি। ইফতিও এখানে পড়তে আসে। সেখান থেকেই আমাদের পরিচয়। কয়েকমাস পর একটা কোম্পানিতে চাকুরী হয়। কোচিং সেন্টারের চাকুরী ছেড়ে দিতে হয়। আমি চট্টগ্রাম চলে আসি। বছরখানেক চাকুরী করি। আমাদের দেখা আর হয়নি। দূরে থেকেই ভালোবাসা। আমাদের বাড়ি থেকে ইফতির বাড়ি প্রায় শত কি,মি দূরেই।
পিতা-মাতাকে বলে ইফতির পরিবারের সাথে কথা বলিয়েছি। বিয়েতে রাজি করাই সবাইকে।
আমার বাবা তখন বলে, "সব নিজেই পছন্দ করলি। তা তোর সরকারি চাকুরী নিতে টাকা লাগবে। আমাদের জমিজামা যা আছে তাতে হবে না। ইফতির বাবা-মাকে বলবো কিছু দিবে কিনা৷ "
আমি বাবাকে বললাম, "আমাদের যা আছে তাতেই আলহামদুলিল্লাহ। যৌতুক নেওয়া দরকার নেই। আমরা যা পারি সব দিয়ে আনবো। কাবিন আমার সামর্থ অনুযায়ী দিবো। বাড়িতে এনে সব আত্মীয় স্বজনদের দাওয়াত দিয়ে খাওয়াবো। মেয়ের পরিবারকে কোন অর্থ খরচ করার দরকার নেই।"
মা বললো, "তোর মতো সবাই ভাবে না রানা।তারপরও তোর সব খুশীই আমাদের। আমরা চাই আমাদের বউ আমাদের মেয়ের মতো এসেই থাকুক। আমাদের কোন মেয়ে নেই। দুটা ছেলের বউ আমাদের দেখবে। ছোটো ছেলের বউ আসতে অনেক বছর লাগবে। ততদিনে মরেও যেতে পারি। তোর বউ আমাদের সব হবে।"
"মা, তাড়াতাড়ি করে ওদের সাথে কথা বলে সব ঠিক করে নেও। কাবিন এক লাখ দিবো।নগদ অর্থ দিয়ে যেটায় চায় পরিশোধ করবো। আর ইফতির জন্য যা পারি সোনা কিনবো। মোহরানা পরিশোধ করেই ইফতি'কে ঘরে তুলতে চাই। এতেই বরকত হবে। "
আমার কথা মতোই বাবা ইফতির পরিবারকে জানায়৷ বললো পরে জানাবে। ইফতির মা আমাকে কল দিয়ে বাকিটা বললো। আমি বুঝাতে চাইলাম এ কথা। সমাজে কাবিন যা লেখা হয় তার অর্ধেক যৌতুক নেয়। মানুষ খাওয়ানো, মেয়ের বাড়ি যাওয়া আসা কত কিছু করে অর্থ নষ্ট হয়। আমি এইসব করে মেয়ের পরিবারের কষ্টে ফেলতে পারবো না৷
ইফতির মা'কে বুঝালাম। আমি বললাম আমার পরিবার ওদের বাড়ি গিয়ে বসে আলোচনা করুক৷ তার আগেই আমাকে মানা করে দিয়েছে।
বসে বসে ভাবছি তখন সব কথা। ইফতির সাথে কথা বলতে চাইলাম। সে আমার কল আর রিসিভ করে নাই। পরেরদিন আমি আবার চেষ্টা করলাম কথা বলতে। বিকালে কল রিসিভ করলো।
আমার কথা সে বুঝতে রাজি নই। বেশি কাবিন না দিলে সম্মান থাকবে না। আমি ইফতিকে বললাম, "আমি তোমাকে ভালোবাসি। এতদিন কথা বলে বিশ্বাস আজও হয় না? তুমি তোমার পরিবারকে বলো,আমাকে দেন। আমি রানার সাথে ভালো থাকবো। একবার চলে এসো দেখো রানীর মতো করে রাখবো। "
ইফতি সেইদিন আমাকে জবাবে বলে, "আমার পরিবারকে বলতে পারবো না। আমার পরিবার যা বলে তা৷ "
"তোমার মা যা বলছে তুমি সাথেই ছিলে। ওই কথা তাহলে "
"হুম, আপনি আপনার মতো থাকেন। আর কখনো কথা বলতে চাই না "
সেইদিন ছিলো ইফতির সাথে শেষ কথা। কয়েক মাসে অনেক চেষ্টা করি। ইফতি যদি আমাকে চাইতো তাহলে আমাকে বুঝতে চাইতো। কয়েক মাস পর সে অন্য জায়গায় বিয়ে করে।
বিয়ের আগের দিন আমাকে কল দিয়ে ইফতি বলে, " আমার বিয়ে হচ্ছে। তোমার মতো অল্প কাবিন দিয়ে নয়। ৩লাখ টাকা কাবিন। "
আমি বললাম, "তোমার পরিবার কী দিচ্ছে? "
গর্ব করে বলে, "মানুষ পঞ্চাশজন খাওয়াবে ছেলে পক্ষের। আর আমার বাবা আমাকে কানের দুল দিচ্ছে। আমার বরকে চাকুরী করতে এক লাখ টাকা দিচ্ছে। "
হেসে বললাম, "একবার খুঁজ নিয়েছো। তোমার বাবা প্রবাস থেকে কি করে টাকা দেয়। আর আমার জন্য এইসব টাকা জোগাড় করতে হতো না৷ মানুষ বুঝতে পারো নি "
ইফতি আর গর্ব করে বলে,"আমার বাবা আপনাকেও এই টাকা দিতো। আপনি তিন লাখ দিতেই ভয় পেয়েছেন। আমার বাবা কত কিছু দিতো। এখন যা দিচ্ছে। "
"আমি কখনো এটা চাই না। এই যে বিয়ে উপলক্ষে যা দিচ্ছে এটাই যৌতুক। আমি এই হারামটা খেতে চাইনি। হ্যাঁ, বিয়ের আগে হয়তো কথা বলাও হারাম। সেটা করে ফেলছি আর কি করার।তাই কথা বলার জন্য আল্লাহর কাছে তওবাও করেছি। তবে বিয়ের পর পুরো জীবনটা আরো ভালো করেই কাটাতে চেয়েছি।লোভ কোনদিনও ছিলো না, আর থাকবেও না।তোমরা জীবনে সুখী হও। এটাই দোয়া করি। "
সেইদিন ছিলো ইফতির সাথে শেষ কথা৷ কি করে সুন্দর করে সমাজে যৌতুকের প্রথা ছড়িয়েছে সেইদিন বুঝলাম। কেউ সুন্দর চিন্তা করলে, তাদের মন'টাও এভাবে টেনে নিচু করতে হয়। বেশি কাবিনের প্রতিযোগিতা মেয়ের পরিবার করতে থাকে। যার ফল যৌতুক চাওয়ার ধরনও পাল্টায়৷
আমি সব ভুলে চাকুরীতে মন দিলাম। রোজার ইদে বাড়ি আসলে। মা একটা মেয়ে দেখাতে নিয়ে যায়। আমাদের গ্রামেই। মেয়েটা কোরআনের হাফেজ। বয়স ১৭-১৮ হবে হয়তো। সাহেদাকে আমিও দেখতে গিয়েছি। আমারও পছন্দ হয়ে যায়। পারিবারিক ভাবে বিয়ে হয়। ইসলামের নির্দেশ মতোই বিয়ে হয়। কাবিনের সকল অর্থ পরিশোধ করে দেই বিয়ের দিন। দেড় লাখ টাকা কাবিনের জন্য নির্ধারণ করা হয়।
আমার শ্বশুর মোহরানা পরিশোধের কথাটা, শুনেই সেইদিন খুশী হয়। বিয়ের দু'দিন পর শ্বশুর বাড়ি গেলে, সাহেদাকে সেই টাকা দেয় আমার শ্বশুর। আমার স্ত্রী আমাকে জিজ্ঞেস করে নিয়ে আসবে কিনা। আমি জবাবে বললাম, "তোমার টাকা যা খুশী করো।আমি নিঃস্বার্থ ভাবে পরিশোধ করে দিয়েছি৷"
রাতে খাবারের পর রুমে বসে আছি। সাহেদা আমার পাশে বসলো। আর আমাকে সাহেদা বলে,আল্লাহর পুরো সেই কথাটা আপনি জানেন না? আল্লাহ বলছে," স্ত্রী লোকদের তাদের মোহরানা আদায় করবে নিঃস্বার্থভাবে। কিন্তু যদি তাঁরা নিজেরা এর কোনো অংশ তোমাদের দিতে খুশী হয়। তবে তা ভোগ করো সানন্দে ও তৃপ্তির সাথে (সুরা-নিসা আয়াত -৪)"
আমি সাহেদার কথা শুনে চুপ করে আছি। সাহেদা আবার বলে, "যে মানুষ'টা নিজে কষ্ট করে জমা করা সব আমায় দিয়েছে। আমাকে এত সহজে একা করে যাবে না। আমি চাই এটা একটা কাজে লাগান। আমাদের জন্য যেনো কোনো উপকার হয়। "
আমার স্ত্রীর আমার উপর ভরসা দেখে, আল্লাহর কাছে অনেক শুকরিয়া আদায় করলাম। স্ত্রী সন্তান ফেলে শহরে চাকুরীর মানে হয় না। চাকুরী ছেড়ে গ্রামে এসে ব্যবসা শুরু করলাম। পরিবার সন্তান সবাইকে নিয়ে সুন্দর একটা জীবন পার করছি৷ আল্লাহর পথে থেকে অল্পেই তুষ্ট আমার স্ত্রী। হারাম টাকা খাওয়ার চিন্তা করলে হয়তো এই সুখটা পেতাম না। আল্লাহর সকল পথই সহজ ও সুন্দর করে দিয়েছেন। আমরা সমাজের সাথে কাবিন ও যৌতুকের তুলনা করতে গিয়ে বিবাহিত জীবনটা কষ্টদায়ক করে ফেলছি।
মোহরানা নির্ধারন করা মেয়েদের অধিকার। তার মানে এই নয়, মানুষকে দেখিয়ে বেশি করতে হবে৷ ইফতি সুখী হয়েছে হয়তো। সেইদিনের পর আর কখনো ইফতির সাথে আমার কথা হয়নি। মাঝে কেটে গিয়েছে ৮বছর। সাহেদাকে ভীষণ ভালোবাসি। আল্লাহর কাছে সবসময়ই দোয়া করি, যেনো সারাজীবন এভাবেই থাকতে পারি। হারামকে আমরা না বলি, যৌতুক আমাদের সমাজের জন্য অভিশাপ। বেশি কাবিন চাওয়াও যৌতুকের জন্য দায়ী। সবার উচিত আল্লাহর পথেই চলা, তবেই সুখ জীবনে থাকবে।
---সমাপ্ত---
গল্প - সন্তুষ্ট।
লেখা-সোলাইমান রানা (দাদা)
Comments
Post a Comment