রক্তের বাইরে গল্প
বৃষ্টিকে নিয়ে যেদিন প্রথম বাসায় আসি সেদিন আমাকে জড়িয়ে ধরে বলেছিল,"তুমি আমার বাবা তাই না?ওর নিষ্পাপ মুখের দিকে তাকিয়ে কিছু বলতে পারিনি।শুধু মুচকি হেসে বলেছিলাম,হুম আম্মু,আমি তোমার বাবা।
বয়স আর কত হবে?তিন বছরের ফুটফুটে বাচ্চা মেয়ে।এক্সিডেন্টে বাবা-মা দুইজনে চোখের সামনে শেষ হয়ে যায়।পুলিশ অনেক চেষ্টা করেও পরিচয় বের করতে না পেরে হাল ছেড়ে দেয়।শেষে থানার ঝামেলা শেষ করে আমার সঙ্গে বাসায় নিয়ে আসি।
আমার স্ত্রী রাহেলা প্রথম প্রথম বেশ রেগে গিয়েছিল আমার উপর।বলল,কার না কার বাচ্চা!শেষে ঝামেলায় পড়লে তুমি সামলাতে পারবে তো?
ওর কথায় মুচকি হেসে বলেছিলাম,আমার তো দুই ছেলে-মেয়ে।উপরওয়ালা যদি আরেকটা মেয়ে দিতে চায় তাহলে তা হাসি-মুখে গ্রহন করাই ভালো।
আমার কথায় রাহেলা আর কিছু বলেনি।কিন্তু ভেতরে ভেতরে বেশ রেগে ছিল।ওর ভয় ছিল,যদি কোনোদিন বৃষ্টিকে নিয়ে ঝামেলায় পড়তে হয় তখন কি হবে!কিন্তু দিন যতই পার হতে লাগল বৃষ্টি যেন রাহেলার চোখের মনি হয়ে উঠল।বৃষ্টিকে ছাড়া রাহেলা কিছুই বুঝতো না।"আম্মু আম্মু" করে ডেকে পুরো বাড়ি হেসে-খেলে বেড়াতো বৃষ্টি।ওর দুই ভাই-বোন অর্ণব এবং মিরার সাথেও বেশ সখ্যতা গড়ে উঠেছিল।নতুন একটা বোন পেয়ে ছেলে-মেয়ে দুটি বেশ খুশি ছিল।
বৃষ্টি যেন আকাশ থেকে হঠাৎ নেমে আসা রাজকন্যা,যে এসে সবার মুখে জ্যোৎস্না ছড়িয়ে দিয়েছে।এই পাঁচ জনের ছোট্ট সংসার নিয়ে বেশ সুখেই কাটছিল দিনগুলো।অফিস থেকে বাসায় ফিরলে যখন তিন ভাই-বোন দৌঁড়ে এসে জড়িয়ে আব্বু বলতো,শরীরের ক্লান্তি সব দূর হয়ে কোথায় যেন অদৃশ্য হয়ে যেত।
বৃষ্টির বয়স তখন বোধ হয় পাঁচ বছর।কিছুদিন পর ছয় হবে।বৃষ্টির আসল জন্মের তারিখ তো আমরা জানতাম না।তাই বৃষ্টি এই বাসায় আসার প্রথম দিনটিকে জন্মদিন পালন করার সিদ্ধান্ত হয়েছিল রাহেলার সাথে।আমরা ওর জন্মদিন পালন নিয়ে বেশ উত্তেজিত ছিলাম।অর্নব-মিরা টেবিলে বসে তাদের স্কুলের পড়া পড়ছিল।আমি বারান্দায় রোদে বসে পেপার পড়ছিলাম।হঠাৎ বৃষ্টি এসে পেছন দিক থেকে আমায় জড়িয়ে ধরে বলল,বাবা কি করছো তুমি?
হেসে বললাম,এইতো আম্মু পত্রিকা পড়ছি।
বৃষ্টি হঠাৎ চুপ হয়ে গেল।কিছুক্ষন পর বলল,আচ্ছা বাবা,স্কুল দেখতে কেমন?স্কুল কি আমাদের এই বাড়ির থেকেও বড়?সেখানে কি অনেক ছেলে-মেয়ে পড়ে?
ওর কথা শুনে ভেতরে যেন রক্তের শীতল স্রোত বয়ে গেল।সত্যিই তো,ওর দুই ভাই-বোন স্কুলে পড়ছে।আর বৃষ্টি সারাদিন বাসায় থাকবে?এই কথা তো ভেবে দেখিনি।চায়ের কাপ হাত থেকে রেখে বৃষ্টিকে জড়িয়ে ধরে বললাম,আম্মু,তুমি পড়াশুনা করবে তোমার অর্নব ভাইয়া-মিরা আপুর মতো?
কথাটা শুনে বৃষ্টি আনন্দে লাফিয়ে উঠল।গলায় চুমু দিয়ে বলল,বাবা,আমি সত্যিই স্কুলে যাবো?
মুচকি হেসে বলেছিলাম,হুম আম্মু কালই স্কুলে ভর্তি করিয়ে দিবো তোমাকে।
তারপর স্কুলে ভর্তি করে দিলাম বৃষ্টিকে।প্রথমদিন স্কুলের গেটে পা রাখতেই শতশত ছোট ছেলে-মেয়েকে দেখে ওর খুশি যেন আর ধরে না!আমি ওর চোখে সেদিন বিস্ময় দেখেছিলাম।দেখেছিলাম আনন্দের একরাশ সমুদ্র।বৃষ্টিকে ক্লাসে দিয়ে আসার পর সে কি কান্না!আমাকে জড়িয়ে ধরে কাঁদতে কাঁদতে বলেছিল,বাবা,তুমি কোথাও যাবে না।আমার সাথে ক্লাসে বসে থাকবে।সেদিন ওর সাথে সারা ক্লাস বসেছিলাম অফিস থেকে ছুটি নিয়ে।তারপর কখনো কখনো আমি ওর সাথে স্কুলে যেতাম,কখনো রাহেলা নিয়ে যেত।বৃষ্টির শুরু হলো নতুন জীবন।
দেখতে দেখতে আমার কাঁচা চুল পেঁকে সাদা হয়ে গেল।অর্নব আর মিরা তখন স্কলারশিপ পেয়ে পাড়ি জমালো অস্ট্রেলিয়া।সরকারি চাকরি করে কত আর টাকা পেতাম!ওদের পড়াশুনার পিছনে খরচ করতে গিয়ে জমি বিক্রি করে দিতে হলো।তারপরও যেন কোনো আক্ষেপ না থাকে ছেলে-মেয়ে দুটোর।বৃষ্টি তখন সবে মাত্র ভার্সিটিতে চান্স পেল।আমার স্বপ্ন পূরন করতে পেরে বৃষ্টির খুশি যেন আর ধরে না!জড়িয়ে ধরে বলেছিল,বাবা,তুমি খুশি তো?
আমি কিছু বলতে পারিনি।চোখদুটো পানিতে তখন ছলছল করে উঠেছিল ওর খুশি দেখে।বৃষ্টির মা-বাবা বেঁচে থাকলে হয়তো আমার চেয়ে বেশি কিছু করতো।
পেনশনের টাকা আর সারাজীবনের সঞ্চয় একত্রে করে একটা ফ্ল্যাট কিনেছিলাম এক বছর পর।কিন্তু ভাগ্যের পরিহাস,গাড়ি এক্সিডেন্টে আমার এক পা অবশ হয়ে যায়।হাসপাতালে বৃষ্টির সে কি কান্না!কিছুক্ষন পরপর ডাক্তার-নার্সদের ডেকে এনে বলতো,আমার বাবার শরীর আরেকবার চেকঅ্যাপ করুন না!শেষে ডাক্তারও বুঝেছিল,মেয়েটা আমাকে কত ভালোবাসে!হাসি-মুখে ডাক্তার-নার্স চেকআপ করে বলতো,না,কোনো সমস্যা নেই।
অর্ণব-মিরাকে আমার এক্সিডেন্টের খবর দেয়া হয়েছিল।কিন্তু ছেলে-মেয়ে দুটো আসেনি।দু-তিন দিন পর কল করে বলতো,নিজের শরীরের যেন যত্ম নিই।তারপর তাড়াহুড়া করে ফোন কেটে দিত।
অবশ হয়ে যাওয়া পায়ের চিকিৎসা করতে গিয়ে বিক্রি করে দিতে হলো সঞ্চয়ের টাকায় কেনা ছোট ফ্ল্যাটখানি।আবার চলে যেতে হলো ভাড়া বাসায়।অর্নব-মিরা অস্ট্রেলিয়া থেকে প্রথম প্রথম টাকা পাঠালেও ফ্ল্যাট বিক্রির পর টাকার পরিমান কমতে শুরু করল আস্তে আস্তে।একসময় টাকা আসা পুরো বন্ধ হয়ে যায়।
বৃষ্টি টিউশনি করা শুরু করল।সকাল আটটায় বেরিয়ে যেত ব্যাগ নিয়ে,বাসায় আসতো রাত দশটায়।একদিন খুব ক্লান্ত হয়ে বাসায় ফিরলো বৃষ্টি।ডেকে আমার পাশে বসতে বললাম।হাসি দিয়ে বলল,বাবা,ঔষধ ঠিকমতো খেয়েছো তুমি?
আমি বললাম,হুম আম্মু ঠিকমতো খেয়েছি।তোকে দেখে খুব ক্লান্ত মনে হচ্ছে।এইদিকে আমার পাশে আয় তো।বৃষ্টির কপালে হাত দিয়ে দেখি,জ্বর শরীরে।
অবাক চোখে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করলাম,এই জ্বর শরীর নিয়ে টিউশনিতে যাওয়ার কি দরকার,আম্মু?
বাবা একদিন বন্ধ করলে,মাস শেষে পুরো টাকা দিতে চায় না।সমস্যা নেই বাবা,আমার শরীর দিব্যি আছে।তুমি একদম চিন্তা করো না তো।
কান্নায় গলা ধরে আসল আমার।জিজ্ঞেস করলাম,আমাদের জন্য তোর খুব কষ্ট হয় তাই না?
বৃষ্টি হাসি-মুখে বলল,দূর কষ্ট হবে কেন?এইযে দিনশেষে তোমাদের হাসি মুখে দেখি,তখন এসব কষ্ট আর কষ্ট মনে হয় না।পৃথিবীতে যার বাবা-মা থাকে তার মতো সুখী এই পৃথিবীতে কেউ নেই।
কথাটা শুনে চোখের পানি আটকে রাখতে পারিনি।আমার রক্তের ছেলে-মেয়ে দুটো এখন উচ্চশিক্ষিত হয়ে একটু কথা বলার সময় পর্যন্ত পায় না।নিজেদের নিয়ে ব্যস্ত হয়ে আছে অস্ট্রেলিয়ায়।আর বৃষ্টি মেয়েটার এখন বিয়ে করে সংসার করার কথা ছিল।আর মেয়েটা আমার আর রাহেলার জন্য দিন-রাত এক করে পরিশ্রম করছে।সত্যিই পৃথিবীটা বড় অদ্ভুদ!
একদিন সন্ধ্যায় আমি আর রাহেলা বিছানায় বসে কথা বলছিলাম।বৃষ্টি তখন টিউশনিতে বাইরে।হঠাৎ রাহেলা বলল,দেখো,রক্তের ছেলে-মেয়েগুলো নিজের বাবা-মাকে দেখে না।অথচ পালক মেয়েটা সারাদিন কত পরিশ্রম করে আমাদের দুজনকে দেখাশুনা করে।রক্তের কেউ কারো জন্য এত ত্যাগ স্বীকার করে কিনা আমার জানা নেই।
আমি বললাম,বৃষ্টিকে আমি আমার মেয়ে মনে করি।ওকে কখনো অন্য চোখে দেখিনি।তবে তুমি যা বলছো তা কিন্তু ফেলে দেয়ার মতো নয়,রাহেলা।আমার খেয়াল ছিল না,দরজা খোলা রয়েছে।তাকিয়ে দেখি,বৃষ্টি দাঁড়িয়ে আছে দরজার সামনে।
হঠাৎ কাঁদতে কাঁদতে দৌঁড়ে এসে বলল,বাবা,তুমি আমার বাবা।আম্মু,তুমি আমার আম্মু।আমি আর কিছু জানি না।
ওর কথা শুনে আমি আর রাহেলা কিছু বলতে পারিনি।শুধু তিনজন মিলে কিছুক্ষন কেঁদেছিলাম জড়িয়ে ধরে।তারপর নিজের হাতে ভাত খাইয়ে দিয়েছিলাম বৃষ্টিকে সেদিন রাতে।
তারপর বৃষ্টির পড়ালেখা শেষ হতেই ভালো চাকরি জুটে যায়।কিছুদিনের মধ্যে প্রমোশন পেয়ে একদিন আমার হাতে চাবি দিয়ে বলে,আব্বু-আম্মু এই বাড়িতে আজ থেকে আমরা থাকবো।এই বাড়িটা তোমার বাবা!
-এই এখানে বসে বসে কি ভাবছো তখন থেকে?বৃষ্টির চলে যাওয়ার সময় হয়েছে।তোমার জন্য তো সবাই অপেক্ষা করছে,বৃষ্টির বাবা,রাহেলার কথায় বাস্তবে ফিরে আসলাম।সেই তিন বছরের ছোট্ট মেয়ে বৃষ্টির আজ বিয়ে।সমাজের নিয়মে মেয়েরা তো সারাজীবন বাবার কাছে থাকতে পারে না।একদিন তাকে বাবার বাড়ি ছেড়ে চলে যেতে হয় স্বামীর বাড়ি।চেয়ার থেকে উঠে আস্তে আস্তে হেঁটে বরের গাড়ির সামনে এসে দাঁড়ালাম।বৃষ্টি লাল বেনারসি শাড়ি পড়েছে।শাড়িতে বেশ মানিয়েছে আমার মেয়েটাকে।
-বাবা,আমি কিন্তু একেবারে যাচ্ছি না।দুদিন পরপর এসে তোমাদের দেখে যাবো।তখন কিন্তু বিরক্ত হতে পারবে না বলে দিলাম,বৃষ্টির কথায় সবাই হেসে ফেলল।মেয়েটা সত্যিই এখনও ছোট রয়ে গেল।
-বিরক্ত হবো কেন রে মা?তুই চলে গেলে তো আমার বাড়িটা বড্ড ফাঁকা হয়ে যাবে।বুড়ো-বুড়ি মিলে এই ছোট্ট বাড়িতে কি আর হই-হুল্লোড় হবে বল?কথাটুকু বলতেই বৃষ্টি এসে জড়িয়ে কাঁদতে শুরু করল।আজ আর নিজেকে সামলাতে পারবো না।মনে হচ্ছে,কেউ যেন আমার থেকে বৃষ্টিকে নিয়ে যাচ্ছে।পৃথিবীতে রক্তের সম্পর্ক ছাড়াও কিছু সম্পর্কগুলো খুব সুন্দর হয়।সেই সম্পর্কগুলো রক্তের মানুষের চাইতে অনেক বেশি কিছু করে।সৃষ্টিকর্তা হয়তো তাই বৃষ্টিকে আমার মেয়ে হিসেবে পাঠিয়েছিলেন আমার ঘরে।
...........সমাপ্ত..........
গল্প:#রক্তের_বাইরে
written by Habib Khan Hridoy
Comments
Post a Comment